চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

মৃত ব্যক্তি ও প্রবাসীরাও প্রকল্পের শ্রমিক!

মৃত ব্যক্তি ও প্রবাসীরাও প্রকল্পের শ্রমিক!

ইমাম হোসাইন রাজু

২৯ অক্টোবর, ২০২৬ | ২:২৫ অপরাহ্ণ

কেউ মারা গেছেন বহু আগে, কেউ পাড়ি জমিয়েছেন প্রবাসে। অথচ কাগজে কলমে সরকারি নথিতে তারাই নিয়মিত কাজ করছেন অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্পের শ্রমিক হিসেবে। কেউ আবার বেঁচে থেকেও জানেন না কোনো প্রকল্পের কথা। আবার প্রকৃত শ্রমিকদের অনেকে জানতেনই না, তাদের নামে কত টাকা লেনদেন হচ্ছে। অথচ তাদের নামেও হয়েছে ব্যাংক লেনদেন, তোলা হয়েছে প্রকল্পের টাকা।

 

সরকারি অর্থ লুটের এমন ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদে। যেখানে চার অর্থবছরে একাধিক প্রকল্পে এই লুটে মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী, ব্যবসায়ী এমনকি রাজনৈতিক নেতা ও ইউপি সদস্যরাও বনে গেছেন দিনমজুর শ্রমিক। আর এভাবেই ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) বাস্তবায়িত প্রকল্পের ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। এ ঘটনায় সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়নসহ দুদকের জালে ফেঁসে যাচ্ছেন ১৩ সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য এবং প্রকৌশলী।

 

দুদক সূত্রে জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাস্তবায়িত অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) প্রকল্প এবং ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরের ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের প্রকল্পে এসব অনিয়ম হয়। দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দুটি খাতের ৯০টি প্রকল্পে মোট ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ইজিপিপির ৩৫টি প্রকল্পে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং ১ শতাংশ করের ৫৫টি প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে।

 

দুদক জানায়, ইজিপিপির মূল উদ্দেশ্য কর্মক্ষম অতিদরিদ্র মানুষের জন্য স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাঁদের আয়-সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু করেরহাট ইউনিয়নের প্রকল্পগুলোতে শ্রমিক নির্বাচনের ক্ষেত্রেই অনিয়ম ঘটে। প্রকল্পের তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৫৮ জনের জবানবন্দি ও ব্যাংক হিসাব বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন অসংগতি পায় সংস্থাটি।

 

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট নথিতে মৃত ব্যক্তি হিসেবে নাসির আহাম্মদ, মো. হারুন, মো. মোস্তফা, হাসনা বানু, রতন ত্রিপুরা, মো. খুরশেদ আলম ও হাসিনা বেগমের নাম উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে প্রবাসী হিসেবে মো. লিটন মিয়া, মো. তারেক ও ইলিয়াসের নাম পাওয়া গেছে। তাঁদের নামেও প্রকল্পের শ্রমিক হিসেবে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্য পায় দুদক। দুদক জানায়, এসব হিসাব থেকে ভুয়া চেক ও টিপসই ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করা হয়।

 

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, প্রকৃত শ্রমিকদের ব্যাংকে নিয়ে টিপসই দিয়ে হিসাব খোলা হলেও তাঁদের দিয়ে বড়জোর চার-পাঁচ দিন কাজ করানো হতো বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন শ্রমিকেরা। তাদের কেউ কেউ দুই থেকে তিন হাজার টাকা পেয়েছেন। সর্বোচ্চ দুইবারের বেশি ব্যাংকে গিয়ে টাকা তোলেননি বলেও জানিয়েছেন অনেকে। কিন্তু ব্যাংক হিসাবের বিবরণী বিশ্লেষণে শ্রমিকদের ৯০ শতাংশের বেশি হিসাবের ক্ষেত্রে প্রায় ৭২ হাজার টাকা করে জমা ও উত্তোলনের তথ্য পায় দুদক। অর্থাৎ, শ্রমিকেরা হাতে যে পরিমাণ টাকা পেয়েছেন, তাঁদের হিসাবের লেনদেনের পরিমাণ ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি।

 

শ্রমিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, কাজ শেষ হওয়ার কথা বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি সদস্যরা তাঁদের কাছ থেকে চেক বই নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেন। পরে ওই চেক ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে টাকা তোলা হয়।

 

এদিকে, ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক কর্মকর্তারা হিসাবধারীর ব্যক্তিগত নথিতে থাকা ছবির সঙ্গে টাকা তুলতে আসা ব্যক্তির চেহারা যথাযথভাবে যাচাই না করেই চেক ও টিপসইয়ের ভিত্তিতে টাকা দিয়েছেন।

 

৩৫ প্রকল্পে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আত্মসাত : দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, করেরহাট ইউনিয়নে বাস্তবায়িত ৩৫টি ইজিপিপি প্রকল্পে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব প্রকল্পের অনুমোদনকারী হিসেবে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মিলন বড়ালের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল।

 

নথিপত্রে একই বা কাছাকাছি ধরনের কাজ একাধিক প্রকল্পে দেখানোর তথ্য পায় দুদক। এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের অন্যান্য খাত-যেমন স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প (এলজিএসপি) ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বাস্তবায়িত কাজ ইজিপিপি কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের প্রকল্পের কাজ হিসেবে দেখানো হয়।

 

১ শতাংশ করের ৫৫ প্রকল্পেও ভুয়া বিল-ভাউচার : ইজিপিপির পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের প্রকল্পগুলোতেও ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পায় দুদক। ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত এসব প্রকল্পের আওতায় নেওয়া ৫৫টি প্রকল্পের প্রায় সব কটির বিল-ভাউচার ভুয়া তৈরি করে সর্বমোট ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাত করা হয়।

 

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, স্থানীয় বিভিন্ন দোকান থেকে খালি ভাউচার সংগ্রহ করে তাতে নিজেদের মতো করে খরচের বিবরণ লিখে বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়। যেসব দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে এসব ভাউচার দেখানো হয়েছে, তাদের কয়েকজন ভাউচার ও তাতে থাকা স্বাক্ষর নিজেদের নয় বলে জানিয়েছেন দুদককে।

 

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া ভাউচার তৈরি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন ছাড়াই প্রকল্পের ব্যয় দেখিয়ে সাবেক চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন ও সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যদের পারস্পরিক যোগসাজশে ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাত করা হয়।

 

চেয়ারম্যান ছাড়াও প্রকল্পগুলো থেকে ইউপি সদস্য কল্পনা রানী চক্রবর্তীর ২১টি প্রকল্পে ৩৭ লাখ ৮৪ হাজার ৭০০ টাকা, শেলী মজুমদারের ১৯টি প্রকল্পে ২৯ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮৩ টাকা, ফেয়ার মিয়া মিন্টুর ১৪টি প্রকল্পে ২২ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং মো. শহীদ উল্লাহর নয়টি প্রকল্পে ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মাসাত করেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়। এছাড়া মো. বেলাল উদ্দিনের ছয়টি প্রকল্পে ১১ লাখ ২৮ হাজার ৭৮৩ টাকা, কোরবান আলীর ছয়টি প্রকল্পে ১০ লাখ ৭৭ হাজার ৪০০ টাকা, তাহেরা বেগমের ছয়টি প্রকল্পে ১০ লাখ ৭৭ হাজার ৪০০ টাকা, মো. আবু তাহের মাস্টারের তিনটি প্রকল্পে পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ৭০০ টাকা এবং মো. আজাদ উদ্দিনের দুটি প্রকল্পে তিন লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে।

 

ফেঁসে যাচ্ছেন সাবেক চেয়ারম্যানসহ ১৩ ইউপি সদস্য-প্রকৌশলী : আলোচ্য ঘটনায় করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়নসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে দুদক। এ ঘটনায় সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলীসহ ১৩ জন ইউপি সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছে দুদক। যেকোনো মুহূর্তে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। অভিযুক্তরা হলেন- সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান (পরবর্তীতে উপজেলা চেয়ারম্যান) মো. এনায়েত হোসেন (নয়ন), সাবেক ইউপি সদস্য কল্পনা রানী চক্রবর্তী, শেলী মজুমদার, তাহেরা বেগম, মো. আবু তাহের (মাস্টার), মো. শহীদ উল্লাহ, মো. বেলাল উদ্দিন, ফেয়ার মিয়া মিন্টু, মো. মহিউদ্দিন, মো. সফি আহাম্মদ, মো. আজাদ উদ্দিন, কোরবান আলী ও সাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিলন বড়াল।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, অনুসন্ধান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট