কেউ এসেছেন শখের পার্সিয়ান বিড়াল নিয়ে, কেউবা খাঁচায় ভরে এনেছেন দেশি মুরগি ও বাহারি কবুতর। পিছিয়ে নেই শিশু-কিশোররাও। নিজের পোষা বাজরিগার ও ককাটিয়েল পাখিটি বিক্রির জন্য দাঁড়িয়ে আছে ক্রেতার অপেক্ষায়। সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার বেলা দুইটা বাজতেই এমন জমজমাট দৃশ্যের দেখা মেলে নগরীর দেওয়ানহাট মোড়ে। সপ্তাহের দুই দিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এই বাজারটি চট্টগ্রাম মহানগরীর সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী পশু-পাখির হাট হিসেবে পরিচিত। জানা যায়, ১৭৫৮ সালে বাংলার নবাবী আমলে তৎকালীন নায়েব সুবেদার ও দেওয়ান মহা সিং এ হাটের প্রচলন করেন। সেই সময় এটি কেবল শৌখিন পশু-পাখির বাজার ছিল না। এটি চালু হয়েছিল বাণিজ্যিক হাট হিসেবে। যা দেওয়ান মহা সিংয়ের নামানুসারে পরবর্তীতে ‘দেওয়ানহাট’ নামে পরিচিতি পায়। মূলত নবাবী প্রশাসনের খাজনা আদায়ের নতুন খাত সৃষ্টি করা এবং প্রজাদের ফসল ও গৃহপালিত পশু-পাখি কেনাবেচার জন্য একটি স্থায়ী বাজার গড়ে তোলাই ছিল দেওয়ান মহা সিংয়ের লক্ষ্য।
নবাবী আমলে চট্টগ্রাম বন্দর ও মূল শহরের সাথে উত্তর চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য অঞ্চলের যাতায়াতের প্রধান সংযোগস্থল ছিল দেওয়ানহাট। আশপাশের গ্রাম ও পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই দেশি হাঁস-মুরগি, বনমোরগ, পাখি ও গবাদিপশু এই হাটে নিয়ে আসতো। নবাবী আমলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং সেনাছাউনির সৈন্যদের দৈনন্দিন মাংস ও ডিমের জোগান দিতেও এই বাজারে নিয়মিত গৃহপালিত পশু-পাখি আনা হতো।
মোগল ও নবাবী আমলে অভিজাত শ্রেণি, জমিদার ও সওদাগরদের মধ্যে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের জন্য কবুতর পোষা, কবুতর ওড়ানোর প্রতিযোগিতা ছিল। সেই সময় ফাইটার মোরগের লড়াইয়ের প্রচলন ছিল। শৌখিন লোকজনের চাহিদা মেটাতেই হাটের এক পাশে উন্নত জাতের কবুতর ও লড়াইয়ের মোরগ বিক্রি শুরু হয়। কালের বিবর্তনে আধুনিক নগরায়ণের ফলে দেওয়ানহাটের সেই আদি বাজারের রূপ বদলে গেলেও, নবাবী আমলের সেই পশু-পাখি ও কবুতর বেচাকেনার ধারা প্রায় পৌনে তিনশ বছর ধরে আজও ঠিকে আছে। এই হাটে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের উপজেলা থেকে খামারি, ক্রেতা ও বিক্রেতা পশু-পাখি কেনাবেচা করতে আসেন। হাটের দিন দুপুর থেকেই ফ্লাইওভারের নিচের ফুটপাত ও সড়কের একপাশ ঘিরে খাঁচা এবং ঝুড়ি নিয়ে বসেন বিক্রেতারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিন বাজারে গেলে বেশ কয়েকজন ক্রেতা জানান, বর্তমানে সব ধরনের পশু-পাখির দাম বেশ চড়া। বিক্রেতারা জানান, পশু-পাখির খাবার, ওষুধ ও রক্ষনাবেক্ষণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা বেশি রাখতে হচ্ছে। এ হাটের মূল আকর্ষণ নানা প্রজাতির কবুতর। এখানে দেশি গোলা, বাঘা ও গিরিবাজ কবুতর জোড়াপ্রতি ৩০০ থেকে এক হাজার টাকায় পাওয়া যায়। তবে উন্নত জাতের কবুতরের দাম অনেক বেশি। বাজারে এক জোড়া লাক্ষা কবুতর এক হাজার থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা এবং সিরাজি দুই হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ী জুনায়েদ জানান, প্রতি জোড়া পোমেরানিয়ান কবুতর চার হাজার ৫০০ টাকা, জাম্বো কবুতর চার হাজার ৫০০ টাকা, আমেরিকান সেন্ট সাত হাজার টাকা এবং ব্ল্যাক কিং সাত হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ময়ূরপঙ্খি, জ্যাকোবিন, ফ্যানটেল, লং ফেস, মুসালদম, রেসার, রেড চেকার ও পাকিস্তানি টেডির মতো উন্নত জাতভেদে প্রতি জোড়া কবুতর ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেচাকেনা হয়। কবুতরের পাশাপাশি খাঁচার পাখির মধ্যে প্রতি জোড়া অস্ট্রেলিয়ান ঘুঘু দুই হাজার টাকা, পাইনঅ্যাপেল কনুর টিয়া আট থেকে নয় হাজার টাকা এবং গ্রিন কনুর টিয়া নয় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বাজরিগার, ককাটিয়েল, ফিঞ্চ, ডায়মন্ড ঘুঘু ও সাধারণ লাভবার্ড জোড়াপ্রতি ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বিরল প্রজাতির বিদেশি লাভবার্ড ও উচ্চমূল্যের শৌখিন পাখির দাম কখনো কখনো জোড়াপ্রতি ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ওঠে। পার্সিয়ান বিড়াল আট থেকে ১০ হাজার টাকায় এবং ছোট-বড় খরগোশ ও গিনিপিগ জোড়াপ্রতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি কোয়েল পাখি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, সাধারণ দেশি মুরগি ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা এবং তিতির ও টার্কি মুরগি এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় পাওয়া যায়। বিদেশি ও শৌখিন জাতের মধ্যে প্রতিটি ব্রাহমা মুরগি সাত হাজার টাকা এবং মডার্ন গেম ও হোয়াইট জাপানিজ ব্যান্টাম মোরগ-মুরগি জোড়াপ্রতি চার হাজার থেকে সাত হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লড়াইয়ের জন্য পরিচিত দেশি ফাইটার মোরগ এবং পার্বত্য অঞ্চলের ‘হেজা’ জাতের মোরগ জোড়াপ্রতি পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকায় বেচাকেনা হয়। পাখির পাশাপাশি এ বাজারে অনায়াসে মিলবে দেশি-বিদেশি হাঁস। চায়না হাঁস ও রাজহাঁসও পাওয়া যায়। এই হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকানগুলোতে পাখির খাবার, ওষুধ, লোহার খাঁচা, মাটির হাঁড়ি এবং কবুতরের পায়ের রিংও বেশ ভালো বিক্রি হয়।
পূর্বকোণ/ইবনুর


















