চট্টগ্রাম সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

ওজন স্কেলে চরম অস্বস্তি

ওজন স্কেলে চরম অস্বস্তি

নাজিম মুহাম্মদ

১৯ অক্টোবর, ২০২৬ | ১২:৩০ অপরাহ্ণ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনের (ওজন পরিমাপক স্কেল) কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ- সড়ক সুরক্ষার যুক্তিতে সীতাকুন্ডের এই ওজন স্কেলে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও দেশের অন্যান্য জাতীয় মহাসড়কে স্থাপিত ওজন স্কেলগুলো বছরের পর বছর ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এসব স্কেলে কোনো ধরনের যানবাহনের ওজন পরিমাপ করা হয় না।

একই দেশে দুই ধরনের পরিবহন নীতির প্রয়োগকে বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বছরের পর বছর। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বার বার তুলে ধরা হলেও কোন গুরুত্ব পাচ্ছে না। তবে স্কেলটি দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা সড়ক ও জনপদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশের অন্য এলাকার ওজন স্কেল যেভাবে পরিচালিত হয় সীতাকুন্ডের স্কেলও একইভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ পরিচালিত হয়। বন্দর থেকে খালাস হওয়া শিল্প কারখানার কাঁচামাল এবং রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকবাহী কন্টেইনার লরিগুলোকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু সীতাকুন্ডের বড় দারোগাহাট ওজন স্কেলে এসে যানবাহনগুলোকে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে- ধীরগতির ওজন পরিমাপ পদ্ধতির কারণে মহাসড়কে নিয়মিত কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এর ফলে নির্দিষ্ট সময়ে কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছানো সম্ভব হয় না। উৎপাদন সূচি (প্রোডাকশন শিডিউল) বিঘ্নিত হওয়ায় কারখানাগুলোর উৎপাদন লাইন বন্ধ রাখতে হয়। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করতে না পারার কারণে উদ্যোক্তাদের পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যায়।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, দেশের অন্যান্য সড়কে যেখানে ২০ থেকে ২৫ টন পণ্য পরিবহন করা যায়, সেখানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৩ টনের বেশি নেওয়া যায় না। এর ফলে পরিবহন খরচ বা গাড়ি ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য পাঠাতে খরচ অনেক বেড়ে যায়। এসব কারণে ব্যবসায়ীরা হয়তো চট্টগ্রাম দিয়ে পণ্য আনতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন অথবা অনিয়মের আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমি বাণিজ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলাম, তিনি যেন আমাদের পক্ষ থেকে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবিটি তুলে ধরেন এবং পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত তিন মাসের জন্য একটি সুযোগ দেন। এই তিন মাসে রাস্তার কতটুকু ক্ষতি হয়, তা আমরা একটু দেখতে চাই। যদি দেখা যায় রাস্তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তবে আমরা আর এই দাবি তুলবো না। আর যদি দেখা যায় যে রাস্তা ঠিক আছে, তাহলে প্রমাণিত হবে আমাদের দাবি যৌক্তিক। এতে জনগণেরও উপকার হবে এবং দেশের ভোক্তাদেরও বাড়তি টাকা গুনতে হবে না।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সভাপতি মীর মোহাম্মদ আবদুস সালাম জানান, দেশের অন্য এলাকায় স্কেল থাকলেও তা কার্যকর নেই। স্কেল নিয়ে শুধু চট্টগ্রামেই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। সীতাকুন্ডের স্কেলের কারণে চট্টগ্রাম থেকে কোনো পণ্য ঢাকায় যেতে পারছে না।

তিনি বলেন, বন্দর থেকে ১৩ টন পণ্য নিয়ে বাংলাদেশের কোথাও ট্রাক যাবে না। যদি এটা ১৮ থেকে ২০ টন হয়, তাহলে ট্রাক ভাড়া কম পড়বে-পোষাবে। যার কারণে জাহাজ থেকে চট্টগ্রামে এখন আর কোনো পণ্য নামে না। লাইটারেজ জাহাজে পণ্য ঢাকায় চলে যাচ্ছে। বর্তমানে আমাদেরকে উল্টো ঢাকা থেকে পণ্য এখানে এনে বিক্রি করতে হচ্ছে। ঢাকা থেকে একটি ট্রাকে ২০/২৫ টন পণ্য অনায়াসে আনা যায়। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে ১৩ টনের বেশি যেতে পারে না।
ব্যবসায়ী নেতা মীর মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, স্কেল পার হলে ইচ্ছে অনুযায়ী পণ্য গাড়িতে বহন করা যায়। তাই শুধু সীতাকুণ্ডে থেকে বন্দর পর্যন্ত ওজন মাপার নিয়ম রাখার কোন মানে নেই। তাহলে কি বিষয়টা এ রকম? বেশি পণ্য নিলে চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ডে স্কেল পর্যন্ত রাস্তা ভাঙবে, স্কেলের পরে রাস্তা ভাঙবে না?

তিনি অভিযোগ করেন, আসলে বিষয়টা ওখানে নয়। বিগত সরকারের আমলে ওবায়দুল কাদেরের লোকজন স্কেল থেকে চাঁদা তুলতো। এখন সেখানে অন্য কেউ আসছে। অথচ বাংলাদেশের কোথাও সড়কে ওজন স্কেলে পণ্য মাপা হয় না। কিছু লোকের ধান্দাবাজির জন্য স্কেলটি বসানো হয়েছে। চট্টগ্রামে এমন কোন নেতা নেই যারা বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাননি। বিষয়টি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে আমাদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। উনি বলেছেন দেখবেন।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, সীতাকুণ্ডের স্কেল হচ্ছে চাঁদাবাজির স্থান। হিলি বন্দর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০-৩০ টন পণ্যভর্তি ট্রাক ফেনী পর্যন্ত আসে। অথচ চট্টগ্রাম থেকে নেয়া যায় না। একটি ট্রাকে ১২ টন পণ্য নেয়া যায়। দেশের অন্য এলাকা থেকে ৩০ টন পণ্য আনতে যেখানে একটি ট্রাক লাগে সেখানে চট্টগ্রাম থেকে একই পণ্য নিতে দুটি ট্রাক লাগে। এতে খরচ বেড়ে যায় দ্বিগুণ। দেশের কোথাও সড়কের ওজন স্কেলের কার্যক্রম নেই। সীতাকুণ্ড ছাড়া।

স্কেলটি দেখভাল করেন সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)। সওজের সীতাকুণ্ড বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী দীপন চাকমা। তিনি জানান, দেশের অন্য এলাকার স্কেলগুলো কার্যকর নেই কথাটি সঠিক নয়। সীতাকুন্ডে স্কেল থাকাতে ওভারলোডিং অনেক কমে গেছে। ওভারলোডিং কমার কারণে একদিকে গাড়ির পার্টস যেমন কম নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে সড়কও নিরাপদ থাকছে।

অনেক ট্রাকে অতিরিক্ত এক্সেল লাগিয়ে বাড়তি চাকা লাগানো হয়েছে, স্কেলের কাছে গেলে চাকাগুলো নামিয়ে দিয়ে স্কেল পার হবার পর তুলে ফেলা হয়- এমন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দীপন চাকমা বলেন, বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগের। আমরা চাইলে এটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সীতাকুণ্ড ছাড়াও বর্তমানে দেশে আরো চারটি ওজন স্কেল রয়েছে। সেগুলো হলো- ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জের বাথুলী (ধামরাই), পদ্মা সেতুর মাওয়া ও জাজিরা উভয় প্রান্তে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হবিগঞ্জের জগদীশপুর ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজিপুরের মাস্টার বাড়ি এলাকায়। এছাড়া আরো ১৯ জেলার ২১ স্থানে নতুন করে ২৮টি ওজন স্কেল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা এলাকায় পাঁচ স্থানে সাতটি, সিলেটে তিন স্থানে চারটি, ঢাকা ও ময়মনসিংহ এলাকায় ছয় স্থানে আটটি, খুলনা ও বরিশাল এলাকায় তিনটি এবং রংপুর ও রাজশাহী এলাকায় চার স্থানে ছয়টি নতুন করে স্কেল বসানো হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-রংপুর কিংবা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন মহাসড়কে স্থাপিত এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোর প্রায় সবকটিই বর্তমানে নিষ্ক্রিয়। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি ত্রুটি এবং পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে সেসব স্থানে ওজন পরিমাপের কোনো কার্যকর কার্যক্রম নেই। সেখানে নামমাত্র সাইনবোর্ড থাকলেও পণ্যবাহী যানবাহন কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই অবাধে চলাচল করছে। এর বিপরীতে সীতাকুন্ডের স্কেলটি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে নজরদারি ও সার্বক্ষণিক কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।
তবে এই কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের চেয়ে প্রশাসনিক জটিলতাই বেশি দেখা যায়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালু ও কাদা স্কেলের সংবেদনশীল সেন্সরে জমে নিয়মিত যান্ত্রিক বিভ্রাট তৈরি করে। সেন্সর বিকল হলে ওজন মাপতে আরও বেশি সময় লাগে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা যখন ওজন পরিমাপ ছাড়াই পণ্য পরিবহন করতে পারছেন, তখন কেবল ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে এই বিধিনিষেধ আরোপকে ব্যবসায়ীরা স্পষ্ট বৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

পূবকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট