আগামী ১০ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি উৎপাদন দৈনিক আরো ৫০ কোটি লিটার বাড়ানোর আশাব্যঞ্জক কথা বলেছেন সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম। দৈনিক পূর্বকোণ স্টুডিওতে মুখোমুখি এক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। সম্প্রতি তাঁর সাথে এ আলোচনায় চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সরবরাহে সংকট নিরসনে উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ, স্যুয়ারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে কার্যকর পদক্ষেপ, রাজস্ব আদায়ের গতিসহ নানা বিষয়ে কথা হয়। আলোচনায় ওয়াসার পানি উৎপাদন বৃদ্ধিসহ রাজস্ব আদায়ে চলমান বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও বলেন তিনি।
প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরে ১৯৯৩ সাল থেকে পানি সরবরাহ করে আসছে ওয়াসা। কিন্তু যে হারে নগরীতে মানুষ বাড়ছে সে হারে পানি উৎপাদন বাড়েনি। ইতোমধ্যে ওয়াসার অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে নগরীতে পানি সরবরাহ হয় দৈনিক প্রায় ৪৭ থেকে ৪৯ কোটি লিটার। ওয়াসার দৈনিক চাহিদা প্রায় ৭০ কোটি লিটারের বিপরীতে এ পানি সরবরাহ হয়ে থাকে।’
নগরীর পানি চাহিদা মেটাতে ওয়াসার নতুন পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, ‘উৎপাদন বাড়াতে কিছু শর্টটার্ম এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছি। শর্টটার্মের মধ্যে ওয়াসার আয়রন রিমোবেল প্ল্যান্টে পানি উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে। যা দৈনিক প্রায় চার কোটি লিটার। দ্বিতীয় ধাপে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প এক্সটেনশন করা হবে, তাতে উৎপাদন বাড়বে দৈনিক ১০ কোটি লিটার। ওই প্রকল্পে শুধু প্ল্যান্টটাই এক্সটেনশন করা হবে। নতুন করে পাইপলাইন বসাতে হবে না। কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-১ এর পাইপলাইন দিয়ে পানি সরবরাহ করা যাবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে দৈনিক ১০ কোটি লিটার পানি যোগ করতে পারলে নগরীর পানি সংকট অনেকটা কেটে যাবে। শুরুতে এ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। এরপর মোহরা পানি শোধানাগার প্রকল্পও এক্সটেনশন করা হবে। এ প্রকল্পের ইনটেক শিফটিং করে নিয়ে যাব কর্ণফুলীতে। এটা নভেম্বর থেকে ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে অতিরিক্ত আরো ৩০ কোটি লিটার উৎপাদন বাড়ানো হবে। একইভাবে মদুনাঘাট পানি সরবরাহ প্রকল্পে উৎপাদন ৩০ কোটি লিটারে উন্নীত করা হবে। কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন করবে। এ প্রকল্পগুলো থেকে আগামী ১০ বছরে ৫০ কোটি লিটার পানি পাওয়া যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পে ১০০ কোটি লিটার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পের শতভাগ পানি বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করা হবে। যেহেতু দক্ষিণ চট্টগ্রামে অনেকগুলো শিল্প কারখানা হবে। সেহেতু পিপিপি মডেলে এ প্রকল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি করে ১০০ কোটি লিটারে নিয়ে যাওয়া হবে। বর্তমানে ওই প্রকল্প থেকে দৈনিক দুই কোটি লিটার পানি কর্ণফুলী টানেলে পাইপলাইন সংযোগ দিয়ে পানি পতেঙ্গাসহ আশপাশের এলাকায় নিয়ে আসার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, ‘ওয়াসার পানি সরবরাহ লাইনগুলো ৩৫ থেকে ৪০ বছর আগের। এসব পাইপলাইন ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবর্তন করে নতুন পাইপ দেওয়া হবে। ২০২৭ সালের মার্চ-এপ্রিলে এ নিয়ে টেন্ডার হবে। এছাড়া যেসব এলাকা ওয়াসার পাইপলাইনের আওতায় নেই, সেসব এলাকা পাইপলাইনের আওতায় আনা হবে। ওয়াসার গৃহিত প্রকল্পগুলো আগামী ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হলে ২০৭০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে পানি নিয়ে কোন সমস্যা হবে না। এর আগে আপাতত কিছু গভীর নলক‚ল বসিয়ে পানি সমস্যা কিছুটা নিরসন করা হবে।’
মেঘনা নদী থেকে পানি আনার কোন পরিকল্পনা আছে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মেঘনা থেকে পানি আনার একটা পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার কারণে এটি আপাতত বাদ দেওয়া হয়েছে। বিকল্প হিসেবে কর্ণফুলী নদী ভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়া হবে। এর মধ্যে গৃহিত সবগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কর্ণফুলী নদীর পানির ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ১০ শতাংশ পানিও নেওয়া হবে না। সুতরাং এটা নদীর জন্য কোন সমস্যা হবে না।’
নদী দূষণ সম্পর্কে প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, ‘দুই ধরনের দূষণ নদী দূষণ করে। এর মধ্যে একটি আবাসিক বর্জ্য ও অন্যটি শিল্প কারখানা বর্জ্য। হালিশহরে বাস্তবায়নাধীন ওয়াসার প্রথম স্যুয়ারেজ প্রকল্প ২০২৭ সালের জুনে চালু করা হবে। আশা করি ২০৩৫ থেকে ২০৪৫ সালের ভিতরে নগরীর সব স্যুয়ারেজ প্রকল্প চালু করা হবে। তাতে নগরীর আবাসিক বর্জ্য সম্পূর্ণ নিরসন হবে। এরপর শুধু শিল্প কারখানার দূষণ থাকবে। এগুলো সমাধানের পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় রয়েছে।’
চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণ খুলশী, কৈবল্যধাম বিশ্বকলোনি ও আশপাশের এলাকা পাঠানটুলি, আগ্রাবাদ, মাদারবাড়ি, হালিশহরসহ যেসব এলাকার গ্রাহকেরা পানি খুব কম পাচ্ছে, আবার নগরীর কোনো কোনো এলাকায় ওয়াসার লাইন আছে, কিন্তু নিয়মিত পানি পায় না। এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, ‘দক্ষিণ খুলশীতে আপাতত একটি গভীর নলক‚প বসিয়ে পানি সরবরাহ দেওয়া হবে। পরে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ আবাসিকে সরাসরি পানি সরবরাহ দেওয়া হবে। একইভাবে কৈবল্যধাম বিশ্বকলোনি ও আশপাশের এলাকা পাঠানটুলি, আগ্রাবাদ, মাদারবাড়ি এলাকাতে গভীর নলক‚প বসিয়ে আপাতত পানি সংকট দূর করা হবে। ২০৩০ সালের পর গভীর নলকূপ রাখা হবে না। সারফেস ওয়াটারের পানি সরবরাহ দেওয়া হবে। বর্তমানে ওয়াসাতে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ওয়াসার মোট উৎপাদনের ৮ শতাংশ পানি সরবরাহ করা হয়।’
ওয়াসার রাজস্ব আদায়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওয়াসার বর্তমানে ২৬০ কোটি টাকা বকেয়া আছে। তবে আমি যোগদানের পর কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কারণে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আগে যেখানে মাসে ১৭ কোটি থেকে ১৮ কোটি আদায় হতো, এখন হচ্ছে মাসে ২৮ কোটি টাকা।’
ওয়াসার অতিরিক্ত বিল বা ভুতুড়ে বিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। অবৈধ সংযোগের ব্যাপারেও ওয়াসা নভেম্বর থেকে অভিযান চালাবে।’
পূর্বকোণ/ইবনুর


















