একসময় চট্টগ্রামের বাণিজ্যের অন্যতম পরিচয় ছিল রিয়াজউদ্দিন বাজার। দেড়শ বছরের ঐতিহ্য বুকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাজারে প্রতিদিন পণ্য কিনতে আসতেন নগর ও দূরদূরান্তের ব্যবসায়ী-ক্রেতারা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাজারের সেই সুনামের পাশে জমেছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। কোথাও পণ্যে ভেজাল, কোথাও ওজনে কারচুপি, কোথাও মূল্যতালিকা নেই। আবার দোকানের মালামাল রাস্তায় ছড়িয়ে রাখায় ব্যাহত হয় ক্রেতাদের চলাচল। বাণিজ্যের এই ঐতিহ্যবাহী ঠিকানায় অনিয়মের এমন চিত্রই ক্রমে হয়ে উঠছে সুনাম রক্ষার চ্যালেঞ্জ।
এবার সেই অনিয়মের বিরুদ্ধে নিজেদের ব্যবসায়ীদেরই কঠোর বার্তা দিয়েছে রিয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতি। বাজারকে বাঁচাতে হলে আগে ব্যবসার পরিবেশ ও সুনাম রক্ষা করতে হবে-এমন অবস্থান থেকে ভেজাল বিক্রি, ওজনে কারচুপি, মূল্যতালিকা না টাঙানো এবং চলাচলের পথ দখল করে মালামাল রাখার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সমিতি। নির্দেশনা অমান্য করলে প্রশাসনিক অভিযানে জরিমানা ও শাস্তির মুখে পড়তে হবে। রাস্তা দখল করে মালামাল রাখলে নেওয়া হবে আইনগত ব্যবস্থাও।
গত বৃহস্পতিবার এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বাজারের ব্যবসায়ী, দোকানমালিক ও কর্মচারীদের জন্য ছয় দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। এর আগে ১৩ অক্টোবর জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমিতির কার্যালয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভেজাল পণ্য বিক্রি, ওজনে কারচুপি, খাদ্যদ্রব্যে জীবননাশক রাসায়নিক মেশানো, মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা এবং অবৈধভাবে পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাত করার মতো অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসন অভিযান চালালে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা মোকাবিলা করতে হবে।
মুদিদোকান, খাদ্যপণ্য, শিশুখাদ্য ও প্রসাধনসামগ্রীর দোকানে দৃশ্যমান স্থানে মূল্যতালিকা টাঙানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারের ছোট-বড় গলি ও উপগলিতে মালামাল সাজিয়ে না রেখে চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দোকানের সীমানা পেরিয়ে রাস্তা দখল করে ব্যবসা চালানোর সুযোগ আর দিতে চায় না সমিতি।
শুধু পণ্য বিক্রি কিংবা দোকানের সামনের জায়গা নয়, ক্রেতাদের সঙ্গে আচরণের বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের। ক্রেতাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, তর্কাতর্কি ও ডাকাডাকি থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। বাজারে নতুন সমিতি গঠন, মার্কেটভিত্তিক মাইকিং কিংবা দোকান উদ্বোধনের আয়োজন করতে হলে আগে সমিতিকে জানাতে হবে। দোকান ভাড়া দেওয়া, ভাড়া বৃদ্ধি কিংবা দোকান বিক্রির ক্ষেত্রেও সমিতিকে অবহিত করার নির্দেশনা রয়েছে।
সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী আব্বাস খান ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবুল কাশেম চৌধুরীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বাজারের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এবং ক্রেতাদের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সবশেষে বাজার ও বাজারের ব্যবসাকে বাঁচাতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আকুল আবেদন জানানো হয়েছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবুল কাশেম চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাজারের উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছি। ধারাবাহিকভাবে একটার পর একটা কাজ করা হচ্ছে। আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে এখনই ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হচ্ছে, যাতে ক্রেতাদের সঙ্গে কোনো অপ্রীতিকর কিছু না হয়।’
রিয়াজউদ্দিন বাজারে ছোট-বড় প্রায় আট হাজার দোকান রয়েছে। আজ শনিবার এসব দোকানে বিজ্ঞপ্তিটি লিফলেট আকারে বিতরণ করা হবে বলে জানান তিনি।
মোহাম্মদ আবুল কাশেম চৌধুরী বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী রিয়াজউদ্দিন বাজার ও বাজারের ব্যবসাকে বাঁচাতে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। ব্যবসায়ী ভাইদের আমরা বলতে চাই-কোনো অন্যায় করব না, কারও অন্যায়কে প্রশ্রয়ও দেব না।’
তবে বিজ্ঞপ্তি জারি করাই শেষ কথা নয়। আট হাজার দোকানের এই বিশাল বাজারে নির্দেশনাগুলো কতটা মানা হচ্ছে, ভেজাল ও ওজনে কারচুপি ঠেকাতে কতটা নজরদারি হচ্ছে, আর দখলমুক্ত থাকছে কি না ক্রেতাদের চলাচলের পথ-সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে বাস্তবায়নে। কেননা, একটি বাজারের ঐতিহ্য শুধু তার বয়সে নয়; ক্রেতার আস্থা, পণ্যের মান, সঠিক ওজন এবং নির্বিঘ্নে কেনাকাটার পরিবেশেই তার আসল পরিচয়। রিয়াজউদ্দিন বাজারকে ‘বাঁচানোর’ লড়াইয়ে এবার সেই পরিচয় ফিরিয়ে আনাই সমিতির সামনে বড় পরীক্ষা।
পূর্বকোণ/নুসরাত


















