চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

ঘুমন্ত নগরে জেগে থাকে রিয়াজউদ্দিন বাজা

ঘুমন্ত নগরে জেগে থাকে রিয়াজউদ্দিন বাজার

নাজিম মুহাম্মদ

১৬ অক্টোবর, ২০২৬ | ১২:০৩ অপরাহ্ণ

রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে নীরব হয়ে আসে বন্দর নগরীর পথঘাট। দিনের কোলাহল শেষে যখন দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায় তখন রিয়াজউদ্দিন বাজারের তিন পোলের মাথায় শুরু হয় এক ভিন্ন কর্মযজ্ঞ। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা সবজি বোঝাই ট্রাকের দীর্ঘ সারি, কুলি-শ্রমিকের হাঁকডাক আর পাইকারদের দরদামে রাতভর মুখর থাকে পুরো বাজার। নগরবাসীর সকালের কাঁচাবাজারের চাহিদা মেটাতে রাতের আঁধারেই হাতবদল হয় মণকে মণ তাজা সবজি। নগরীর প্রধান পাইকারি কাঁচাবাজার রিয়াজউদ্দিন বাজারে এক রাতেই গড়ে এক থেকে দেড় কোটি টাকার সবজি লেনদেন হচ্ছে। মধ্যরাত থেকে ভোর ছয়টার মধ্যেই সম্পন্ন হয় বিশাল অঙ্কের পাইকারি কেনাবেচা।

 

 

 

ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা যায়, বাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দুই শতাধিক সবজির আড়ত রয়েছে। প্রতিদিন রাতে বগুড়া, যশোর, মেহেরপুর, সীতাকুণ্ড ও দোহাজারীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকভর্তি সবজি এসে পৌঁছায় এখানে। মৌসুমভেদে লেনদেনের তারতম্য ঘটে। শীত মৌসুম ও রমজানে ১০০ থেকে ১৫০টির বেশি সবজিবাহী ট্রাক আসে। তখন রাতের লেনদেন দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। তবে বর্ষায় সরবরাহ কমলে তা নেমে আসে ৫০ থেকে ৮০ লাখ টাকায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দফা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর প্রভাব পড়ছে পাইকারি দরে, যার বোঝা চাপছে সাধারণ ভোক্তার কাঁধে।

 

 

রিয়াজউদ্দিন বাজার আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ফারুক শিবলী জানান, বাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দুই শতাধিক সবজি ও কৃষিপণ্যের আড়ত রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে দূরদূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসার খরচ অনেকটা বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, আগে উত্তরাঞ্চলের মেহেরপুর, কুষ্টিয়া কিংবা চুয়াডাঙ্গা থেকে একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ৩০ হাজার টাকা। দুই দফা তেলের দাম বাড়ার পর সেই ভাড়া বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৪২ থেকে ৪৪ হাজার টাকায়। এছাড়া চট্টগ্রামের আশপাশের এলাকা বা অন্যান্য দূরপাল্লার গাড়িতেও টনপ্রতি এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ২০/২২ টি সবজিবাহী ট্রাক আসছে। বাজারে আগাম শীতকালীন সবজি হিসেবে মেহেরপুর অঞ্চল থেকে ফুলকপি ও বাঁধাকপি আসতে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, পটল, ঝিঙে ও বেগুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজিও আসছে। শীতের মৌসুম পুরোদমে শুরু হতে আরও অন্তত এক মাস সময় লাগবে।

 

ব্যবসায়ী নেতা ফারুক শিবলী জানান, কাঁচামাল পচনশীল হওয়ায় ট্রাকে থাকলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাজারে রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বড় ট্রাক প্রবেশের নিয়ম রয়েছে। কোন কারণে পথে দেরি হলে এবং নির্ধারিত সময়ের পর গাড়ি শহরে ঢুকলে তা সরাসরি বাজারে আসতে পারে না। তখন বাধ্য হয়ে বিআরটিসি মোড়ে গাড়ি থেকে সবজি খালাস করতে হয়। সেখান থেকে ভ্যান বা ছোট গাড়িতে মাল আড়তে আনতে গাড়িপ্রতি আরও কয়েক হাজার টাকা বাড়তি খরচ যোগ হয়। পচনের ঝুঁকি এড়াতে বাধ্য হয়েই বাড়তি টাকা খরচ করছেন আড়তদাররা।

 

 

গত বুধবার রাতে সরেজমিনে দেখা যায়, তিন পোলের মাথায় ট্রাক থামার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় পণ্য নামানোর ব্যস্ততা। ভারী বস্তা কেউ ঠেলাগাড়িতে তুলছে আবার কেউ কাঁধে নিয়ে পৌছে দিচ্ছে আড়তে। পাইকাররা পণ্যের মান দেখে দরদাম হাঁকছেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই এসব সবজি পৌঁছে যাচ্ছে নগরীর অলি গলিতে।

 

তিনপুলের মাথায় ব্যস্ত সড়কে দীর্ঘ সময় ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকা এবং মালামাল ওঠানামার কারণে রাতে সাধারণ মানুষের চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে বৈকি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচাবাজারের বর্জ্য। পণ্য নামানো ও বাছাইয়ের সময় নষ্ট পাতা ও পচা সবজি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে দুর্গন্ধ ছড়ায়।

 

 

পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারে সীমিত সরবরাহের কারণে বর্তমানে পাইকারদের আনাগোনা কিছুটা কম। তবে ব্যবসায়ীদের আশা, আগামী মাস নাগাদ শীতের সবজি পুরোদমে বাজারে নামলে ট্রাকের সংখ্যা বাড়বে। ভোরের আজান পড়ার সাথে সাথে পাল্টে যেতে শুরু করে তিনপুলের মাথার দৃশ্য। রাতের ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফেরেন আড়তের শ্রমিকরা।

 

পূর্বকোণ/আদর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট