কালুরঘাট সেতু পার হলেই চোখে পড়ে কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় শিল্প-কারখানা। সারি সারি বালুর স্তূপ, নানা স্থাপনা। ফসলি জমির উপর নির্মাণ করা হয়েছে এসব কারখানা। এক সময় এসব জমিতে ব্যাপক ধান ও সবজি চাষাবাদ হতো।
কালুরঘাট সেতু থেকে নেমে আরাকান সড়ক ধরে এগোতে দেখা যায়- রাস্তার দুই দিকে গড়ে ওঠেছে শিল্প-কারখানা, বাড়িঘর, মার্কেট ও নানা ধরনের স্থাপনা। শেষপ্রান্ত মিলিটারি পুল পর্যন্ত গেলাম। ৭-৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দেখা যায় একই অবস্থা, ছোট-বড় মিলকারখানা, মার্কেট, দোকানসহ নানা স্থাপনা। রাস্তা থেকে খোলা আকাশ দেখা দায় হয়ে পড়েছে। শাকপুরা ও গোমদণ্ডী ফুলতলী এলাকায় কথা হয়, আবদুল করিম, নেজামত উল্লাহসহ অন্তত ৫ জনের সঙ্গে। তারা বললেন, নদী-খাল ও রাস্তার পাশে সব ধানী জমি ছিল। প্রচুর চাষাবাদ হতো। নিজেদের চাহিতা মিটিয়ে অন্য এলাকায় সরবরাহ করা হতো। এখন সিংহভাগ জমি চলে গেছে শিল্প-আবাসন ও ব্যবসায়ী খাতে। ধানী জমি ছাড়াও খাল-নালা ও নদীর তীর ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এতে আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে ধানী জমি। জলাবদ্ধতার কারণে বাকি জমিও চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
একই চিত্র দেখা যায়, শহরতলী উপজেলা বোয়ালখালী ছাড়া কর্ণফুলী, পটিয়া, আনোয়ারা, হাটহাজারী, সীতকুণ্ড ও মিরসরাই উপজেলায়। এসব উপজেলা দ্রুত নগরায়নের কারণে কমছে ধানী জমি। বাড়ছে অনাবাদি-পতিত জমির পরিমাণ।
বোয়ালখালীর করলডেঙ্গা ইউনিয়নের ষাটোর্ধ্ব মো. হাসান বলেন, ‘নিজের তিন কানি (১২০ শতক) জমিতে চাষাবাদ করতাম। সারা বছরের তিন বেলা ভাতের জোগান হতো। আর ধানের ভূষি ও খড় থেকে গো-খাদ্যের জোগান হতো। ১০ বছর পর মনে হচ্ছে, যেন স্বপ্নের মতো সেই দিনগুলো। এখন কেনা চালে ভাত খেতে হয়। গোয়ালে ৩টি গরু ছিল। এখন আর নেই।’ তিনি বলেন, ‘বছরে তিন ফসলি ধান চাষ হতো। গত ১০-১২ বছর ধরে চাষাবাদ আর হয় না।’
হাসান ছাড়া আরও ৫-৬ জনের সঙ্গে কথা হয়। তারা বললেন, এই বিলে আউশ, আমন ও বোরো ধানের চাষ হতো। পাইজাম, কালো জিরা, বাসমতি, লাল পাইজামসহ নানা প্রজাতির সুগন্ধি ধানের আবাদ হতো। দীর্ঘদিন ধরে খিলা (অনাবাদি) পড়ে রয়েছে শত শত কানি জমি।
এই সংকটের মধ্যে আজ উদযাপিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীকালের পুষ্টি’। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই দিবসটি ঘোষিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) যৌথভাবে এটি পালন করে থাকে।
কমছে ফসলি জমি: ১৯৯৭ সালে কৃষি জরিপ অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ফসলি জমির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর। এরমধ্যে চাষাবাদের আওতায় ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমি। বর্তমানে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ হচ্ছে দুই লাখ ১৩ হাজার ২৪১ হেক্টর জমি।
কৃষি বিভাগের গবেষণা বলছে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, নগর-শিল্পায়নের ফলে ফসলি জমি ক্রমাগত কমছে। ইটের ভাটা, শিল্প-কারখানা, ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাটসহ নানা স্থাপনা নির্মাণের কারণে প্রতিবছর এক শতাংশ কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।
পতিত জমি: কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ দুই লাখ ৩১ হাজার ৩২১ হেক্টর। এরমধ্যে আবাদযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ ৮ হাজার ৮৮৯ হেক্টর।
উপজেলা কৃষি অফিসার শাহানুর ইসলাম বলেন, প্রতিবছর ১ শতাংশ হারে কৃষি জমি কমছে। যুগের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বর্তমান কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে হবে।
পতিত থাকার ১০ কারণ: জমি পতিত থাকার ১০টি কারণ চিহ্নিত করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কারণগুলো হলো- সেচ সুবিধার অভাব। খাল ভরাট হয়ে যাওয়া। নিচু এলাকায় নিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকা। স্লুইস গেট নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার অভাব। চরের জমি বন্দোবস্ত না হওয়া। দুর্গম এলাকা। পাহাড়ের পাদদেশের জমিতে বন্যহাতির আক্রমণ। জলাবদ্ধতা এলাকায় জোঁকের উপদ্রব। জমির মালিকদের অনাগ্রহ ও ইটভাটার জন্য টপসয়েল কেটে নেওয়া।
বাড়ছে খাদ্যঝুঁকি: খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে বছরে চালের চাহিদা হচ্ছে ১৬ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ টন। চাহিদার বিপরীতে ধান উৎপাদন হয় ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৫ টন। এই তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা (কারিগরি) রাজীব কুমার দে।
আর কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, উৎপাদনের ১১ শতাংশের বেশি বীজও অপচয় হয়। মোট উৎপাদন থেকে আরও প্রায় এক লাখ টন চাল কমবে। সেই হিসাবে প্রকৃত খাদ্য উৎপাদন দাঁড়াবে পৌনে ৮ লাখ টনের মতো। খাদ্যঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৫ টন।
অথচ ২০১৫ সালে চট্টগ্রামে খাদ্যঘাটতির পরিমাণ ছিল চার লাখ ২৩ হাজার ৬২৫ মে. টন। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ওই সময়ে চট্টগ্রামে খাদ্য চাহিদা ছিল ১১ লাখ ৬৯ হাজার ২৬১ টন। খাদ্য উৎপাদন হতো ৮ লাখ ৪৩ হাজার ২০৪ টন। অপচয় ও বীজ ধরা হয় ১১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৯৭ হাজার ৫৫৮ টন।
খাদ্য ও কৃষি বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১১ বছরে চট্টগ্রামে খাদ্যঘাটতি বেড়েই চলেছে। অপরদিকে আশঙ্কাজনক হারে কমছে খাদ্য উৎপাদন। এরফলে খাদ্য আমদানি বাড়ছেই।
জাতিসংঘের ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিশ্বের ১০টি দেশের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষের একটি বড় অংশ বসবাস করে। এফএও-এর তথ্যগতে, মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য ঝুঁকিতে রয়েছে।
চাষ বাড়ানোর সুপারিশ: পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার চার মোটাদাগে পাঁচটি সুপারিশ করেছে কৃষি অধিদপ্তর।
সুপারিশগুলো হলো : ১. সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ। বিশেষ করে এলএলপি, ফিতা পাইপ, বারিড পাইপ ব্যবহার করে সেচের এলাকা বাড়ানো। ২. খাল খনন। ৩. স্লুইস গেট নির্মাণ। পরবর্তীসময়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনা। ৪. চরের জমি বন্দোবস্ত প্রদান। ৫. বিশেষ প্রণোদনার মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকা ও পাহাড়ের পাদদেশে পতিত জমিতে কলাবাগান স্থাপন করা। নিচু এলাকায় কচু জাতীয় সবজির চাষ করা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে আবাদযোগ্য পতিত জমি অন্তত এক মৌসুমে চাষের আওতায় আনা সম্ভব বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গবেষণায় উঠে এসেছে।
পূর্বকোণ/আদর


















