প্রথম বিয়ের কথা জেনে যাওয়ায় পরিকল্পিতভাবে দ্বিতীয় স্ত্রীকে হত্যা করে চট্টগ্রামের শিকলবাহা খালে বস্তাবন্দি করে ফেলে দেয়ার চাঞ্চল্যকর রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মেট্রো। এ ঘটনায় পিবিআই দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন- মো. মুসলিম উদ্দিন (৩৯) ও শুক্কুর আহম্মদ (২৪)।
মামলার বিবরণ ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, বাঁশখালী উপজেলার ৪নং ওয়ার্ডের শিলকুপ ইউনিয়নের মনকি চর দিঘির পাড় এলাকার নুরুল ইসলামের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস (২৮)। তিনি ম্যাফ সুজ লিমিটেড নামে একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের পর গত বছরের ৪ তারিখে রাজা মিয়া প্রকাশ রাজু নামে এক যুবকের সাথে প্রেমে জড়িয়ে তাকে বিয়ে করেন।
বিয়ের পর জান্নাতুল তার ৭ বছর বয়সী কন্যা তানিসাকে নিয়ে রাজুর সাথে চান্দগাঁও থানাধীন বাহির সিগন্যাল বেপারী পাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তবে বিয়ের কিছুদিন পরেই রাজুর প্রথম বিয়ের খবর প্রকাশ পায়। তার প্রথম স্ত্রী রুবি আক্তার শিকলবাহায় নিজ বাড়িতে বসবাস করছিলেন। প্রথম বিয়ের খবর প্রকাশ পাওয়ার পর রাজুর সাথে জান্নাতুলের পারিবারিক কলহ শুরু হয়।
সেই কলহের জেরে স্ত্রী জান্নাতুলকে পথ থেকে সরিয়ে দিতে রাজু তার পূর্বপরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সাথে পরামর্শ করেন। এরপর তারা প্রথমে কালুরঘাট ব্রিজ এলাকার এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিকতার আশ্রয় নিয়ে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। তবে কবিরাজি পন্থায় কাজ না হওয়ায় রাজা মিয়া জান্নাতুলকে হত্যা করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৮ সন্ধ্যা ছয়টায় রাজা মিয়া জান্নাতুলকে বেড়ানোর কথা বলে ঘুরতে নিয়ে যান। কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় আগেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল সাম্পান নৌকা। নৌকাটির মালিক ছিলেন রাজুর প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ। নৌকায় আসামি মুসলিম উদ্দিন ও অজ্ঞাত আরও একজন আসামি (আরমান) অপেক্ষা করছিলেন।
জান্নাতুলকে নিয়ে আসামিরা সাম্পানে ওঠে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে। নৌকাটি চালাচ্ছিলেন মুসলিম উদ্দিন এবং নৌকার ভেতর থেকে পানি সেচ দিচ্ছিলেন শুক্কুর। রাত ৮ টার দিকে নৌকায় রাজা মিয়ার সাথে জান্নাতুলের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে রাজু তার স্ত্রীর মোবাইল কেড়ে নিয়ে পানিতে ফেলে দেয়। জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরে তাকে বস্তায় ভরে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করে রাজু ও তার সহযোগী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি। এরপর তার হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে বস্তায় ভরে খালে ফেলে দিয়ে তারা চলে আসে। এরপর গত ২ আগস্ট ভাসমান অবস্থায় এক নারীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ। এ ঘটনায় জান্নাতুলের মা বাদী হয়ে রাজুসহ অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি হত্য মামলা দায়ের করেন। গত ৬ অক্টোবর এ মামলার দায়িত্ব পায় পিবিআই।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, এ হত্যার মূল সহযোগী মো. মুসলিম উদ্দিনকে টেকনাফ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মুসলিমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপর আসামি শুকুর আহম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটিও জব্দ করা হয়। গত ১৪ অক্টোবর মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। গ্রেপ্তার শুকুর আহম্মদকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলাটির তদন্ত চলমান রয়েছে।
পূর্বকোণ/পিআর


















