চট্টগ্রাম সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ থেকেই সূচনা হোক পরিচ্ছন্ন নগরীর

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১২ অক্টোবর, ২০২৬ | ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের জাকির হোসেন সড়কে ওমর গণি এমইএস কলেজ ও ইস্পাহানি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রবেশপথের দিকে তাকালে নগরীর পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুই বিশিষ্ট দানবীরের নামে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশমুখে যত্রতত্র পোস্টার, ব্যানার ও প্রচারসামগ্রীর উপস্থিতি দৃষ্টিকটু। শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের যাতায়াতের এই পথটুকু কি পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও নান্দনিক হতে পারে না? দুঃখজনক হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকার বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথেও একই দৃশ্য দেখা যায়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন যখন ‘ক্লিন, গ্রিন অ্যান্ড হেলদি সিটি’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে এবং নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে উদ্যোগী হচ্ছে, তখন এই বাস্তবতা নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। একটি পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলার কাজ শুধু প্রচারণা, স্লোগান কিংবা বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রতিদিনের দায়িত্বশীলতা, নিয়মিত তদারকি এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয়।

 

দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পাঠদান ও পরীক্ষার ফলাফল অর্জনের জায়গা নয়। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও সৌন্দর্যবোধ গড়ে তোলারও অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। সেই বিবেচনায় একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ যেমন পরিচ্ছন্ন হওয়া প্রয়োজন, তেমনি তার প্রবেশপথ, সীমানাপ্রাচীর ও আশপাশের পরিবেশও হওয়া উচিত পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন।
ওমর গণি এমইএস কলেজ ও ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে যখন অনুমতিহীন পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে- প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কি বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে? নিজেদের ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশমুখ ও সংলগ্ন এলাকার পরিবেশ রক্ষায়ও তাদের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। সড়ক, ফুটপাত কিংবা জনসাধারণের চলাচলের জায়গা পরিষ্কার রাখা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে তাই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হবে, এমন নয়। কিন্তু নিজস্ব সীমানার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে অনুমতিহীন পোস্টার লাগানো প্রতিরোধ করা এবং আশপাশের পরিবেশ নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরা চাইলে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে পারেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রবেশপথ পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নিতে পারেন। প্রয়োজনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যায়। এতে পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বাস্তব জীবনেও তার প্রতিফলন ঘটবে।

 

নিয়মিত পরিচালিত হোক সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান
একটি নগরীর পরিচ্ছন্নতা রক্ষার প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক ও ফুটপাত পরিষ্কার রাখা, উন্মুক্ত স্থানে ময়লা জমতে না দেওয়া এবং জনপরিসরে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্যেকের কাজের সঙ্গে এই লক্ষ্য সরাসরি সম্পর্কিত।
নগরীর কোনো এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা হলে সেখানে আবারও ময়লা জমবে, পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে যাবে দেয়াল ও খুঁটি। ফলে সাময়িক পরিচ্ছন্নতা দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনতে পারবে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ, হাসপাতাল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড় এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থানগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের সুনির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ, দায়িত্ব পালনের নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও ময়লা জমে থাকলে কিংবা অনুমতিহীন প্রচারসামগ্রী জনপরিসরের সৌন্দর্য নষ্ট করলে তা অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এ ক্ষেত্রে নগরবাসীর সহযোগিতাও অপরিহার্য। নির্ধারিত স্থানের বাইরে বর্জ্য ফেলা, যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগানো কিংবা ফুটপাত দখল করে জনচলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

 

বিলবোর্ড অপসারণে সাফল্য, এবার নিয়মিত পরিচ্ছন্নতায়
চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় অনুমোদনহীন বিলবোর্ড অপসারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব বিলবোর্ড নগরীর দৃশ্যমান সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি জনপরিসরের শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। এ বিষয়ে দৈনিক পূর্বকোণসহ সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিয়ে অনুমোদনহীন বিলবোর্ডের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে নগরীর দৃশ্যমান সমস্যার সমাধান সম্ভব। সংবাদমাধ্যমের কাজ কেবল অনিয়ম তুলে ধরা নয়; ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং নাগরিক স্বার্থে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের দাবিও সামনে আনা।
অনুমোদনহীন বিলবোর্ডের বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়া গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যত্রতত্র পোস্টার-ব্যানারের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
তবে বিলবোর্ড অপসারণের সাফল্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না। নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় এটিকে একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিচ্ছন্ন সড়ক, বাধামুক্ত ফুটপাত, পরিচ্ছন্ন দেয়াল, সুশৃঙ্খল বিজ্ঞাপনব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত সবুজায়ন, সবকিছুর সমন্বয়েই একটি বাসযোগ্য নগরী গড়ে ওঠে।

 

সৌন্দর্যবর্ধন মানে শুধু সাজসজ্জা নয়
নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের কথা উঠলে অনেক সময় দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, সড়কদ্বীপে গাছ লাগানো, আলোকসজ্জা কিংবা বিভিন্ন স্থাপনা সংস্কারের বিষয়গুলো সামনে আসে। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত না করে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নিলে তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
একটি সড়কের দুই পাশে সুন্দর গাছ লাগানো হলো, অথচ ফুটপাত ময়লায় ভরা; কোনো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের সৌন্দর্য বাড়ানো হলো, অথচ পাশের দেয়াল পোস্টারে ঢাকা, তাহলে সেই সৌন্দর্যবর্ধন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য রক্ষার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন যে পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে, তা তাদের মনোজগৎ ও আচরণেও প্রভাব ফেলে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তাদের শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যবোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বিপরীতে, চারপাশে অব্যবস্থাপনা ও অপরিচ্ছন্নতা দেখতে দেখতে তারা যদি সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তবে নাগরিক দায়িত্ববোধের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

 

পরিচ্ছন্ন নগরীর জন্য চাই যৌথ অঙ্গীকার
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ‘ক্লিন, গ্রিন অ্যান্ড হেলদি সিটি’ গড়ার প্রত্যয়কে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পরিচ্ছন্নতাকে দৈনন্দিন নগর ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে। এ দায়িত্ব শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নয়; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ওয়ার্ড পর্যায়ের প্রতিনিধিসহ করপোরেশনের পুরো কর্মব্যবস্থাকে এ কাজে সক্রিয় থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জাকির হোসেন সড়কের ওমর গণি এমইএস কলেজ ও ইস্পাহানি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রবেশপথ পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। নগরীর অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে এসব স্থানকে পরিচ্ছন্নতা রক্ষার দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

 

দায়িত্ব আছে রাজনীতিবিদগণেরও
পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে রাজনীতিবিদগণেরও দায়িত্ব আছে। আমাদের দেশের একটা সংস্কৃতিই হয়ে গেছে, যে কোন একটা ইস্যু নিয়ে বড় বড় নেতাদের ছবির নিচে নিজের ছবি লাগিয়ে যত্রতত্র ব্যানার- পোস্টার লাগানো। খবর নিলেই জানা যাবে, নিজের এলাকার লোকই ব্যানারের এসব স্থানীয় নেতাকে চেনেন না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এসব ব্যানার ফেস্টুন ঝুললেও ‘নেতার ভয়ে’ সেগুলো অপসারণ করা হয় না। প্রকৃত রাজনীতিবিদগণ নগরীকে ভালোবেসে যদি এসব ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে ব্যানার পোস্টার ফেস্টুন লাগানোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, কারো সাধ্য আছে এগুলো ঝুলানোর!
আমরা চাই না পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুধু বিশেষ দিবস, সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ কিংবা জনদাবি ওঠার পরই দৃশ্যমান হোক। বরং প্রতিদিনের কাজের মধ্য দিয়েই এর প্রতিফলন ঘটুক।
পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ার প্রথম শর্ত হলো দায়িত্বশীলতা, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের, সিটি করপোরেশনের এবং নাগরিকদের। শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা অর্থবহ করতে হলে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ থেকেই সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নান্দনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখন প্রয়োজন ঘোষণার চেয়ে ধারাবাহিক কাজের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট