নেই দোকান, নেই কোন ছাউনি, একটি মাত্র সেলাই মেশিন নিয়ে কাজ করছেন তিনি। কিছুক্ষণ পর পর মহিলারা এসে কাপড় সেলাইয়ের জন্য দিয়ে যাচ্ছেন। দূর থেকে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটি দেখে ভাবছিলাম মানুষের রিজিক আল্লাহ কীভাবে লিখে রেখেছেন। কোন দোকান না থাকার পরও মহিলাদের কাপড় সেলাইয়ে কেন এত আস্থা এখানে। তাই কৌতূহল বশত সামনে গিয়ে নিজ থেকে কথা বলা শুরু করলাম। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর ধরে একই জায়গায় তিনি সেলাইয়ের কাজ করে যাচ্ছেন। একসময় এই জায়গায় তিনতলা মার্কেটের নিচতলায় ছিল তার টেইলার্সের দোকান। পরবর্তীতে মার্কেট ভেঙে ফেলার পরও তিনি ছোট এই জায়গায় একটা সেলাই মেশিন নিয়ে বসে কাজ করে যাচ্ছেন। পাঠক বলছিলাম নগরীর মেহেদীবাগের এরিস্টোকেয়ার হসপিটালের দক্ষিণ পাশে হসপিটাল ভবনের পাশে ছোট একটা জায়গায় বসে কাজ করা টেইলার্সের দোকানদার দেলোয়ার হোসেন
সাইদের কথা। ছাব্বিশ বছর আগে কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানার চাঁনপুর গ্রাম থেকে চট্টগ্রামে এসে টেইলার্সের দোকান দেন মেহেদীবাগস্থ রমনীয়ার পাশে। সাইদ টেইলার্স নামক দোকানে ঘুরেছে তার ভাগ্যের চাকা। নিজে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করছেন। এসএসসি পরীক্ষা দিতে না পারলেও ৩ ছেলে ও ২ মেয়েকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন। বড় ছেলে আশিকুর রহমান বায়েজিদ চট্টগ্রামের পরিবেশ অধিদপ্তরে চাকরি করছেন। বাকি ২ ছেলে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে এখনো পড়ালেখা করছেন।
সাইদ জানান, এক সময় এখানে তার দোকান ও কারখানা ছিল। কারখানায় কয়েকজন কর্মচারী কাজ করতেন। সারাদিন কাপড় সেলাইয়ের যে অর্ডার পেতেন সেগুলো কারখানায় প্রস্তুত করা হতো। কিন্তু মার্কেট ভেঙে ফেলার পর কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নিলেও, তিনি তার পুরোনো এই স্থানটি আঁকড়ে ধরে আছেন। কারণ বিগত ছাব্বিশ বছরে অনেক নারী-পুরুষের সাথে তার পরিচয় হয়েছে। যারা এখনো তার কাছে কাপড় সেলাই করতে আসেন। অন্যত্র দোকান নিলে তার এসব কাস্টমার থাকবে না বলেই তিনি এখানেই রয়ে গেছেন।
পরিবার কুমিল্লায় থাকলেও সাইদ থাকেন শহীদ মির্জা লাইনে। সারাদিন দোকানে সময় দিয়ে বাসায় গিয়ে নিজে রান্নাবান্না করেন। মাঝে মাঝে কাজের মহিলা এসে রান্না করে দেন।
সাইদের স্বপ্ন কি জিজ্ঞেস করতে তিনি জানান, বড় কোন স্বপ্ন নেই। এখন শুধু একটাই স্বপ্ন, স্ত্রীকে নিয়ে আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করতে হজে যাওয়া। বড় ছেলে আশিকুর রহমান বায়েজিদ সরকারি চাকরি ছেড়ে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করছে। তার ইউরোপ যাওয়ার পরপরই সাইদ স্ত্রীসহ হজে যাবেন।
তিনি জানান, টেইলার্সের দোকানের পাশাপাশি তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে টেইলারিংয়ের বিভিন্ন মালামাল সাপ্লাই দেন। যেটুকু আয় করেন তা দিয়েই তার ভালোভাবেই চলে যাচ্ছে।
তার ভাষায়, রিজিক তো আল্লাহর হাতে, তাই এসব নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। তিনি তার কর্ম নিয়েই সন্তুষ্ট। তাই সুঁই সুতোর মেশিনকে সঙ্গী করে বাকি জীবনটা সুখে কাটাতে চান তিনি ।
পূর্বকোণ/মিফতা


















