চট্টগ্রাম রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

গরিবের চাল-আটা  নিয়ে ‘চালবাজি’

গরিবের চাল-আটা  নিয়ে ‘চালবাজি’

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

১১ অক্টোবর, ২০২৬ | ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম নগরীর মোহরা খেজুরতল এলাকার ফরিদা খাতুন। স্বামী অসুস্থ-অক্ষম। বাসাবাড়িতে কাজ করে ৪ জনের সংসার চালাতে হয় তাকে। অভাব-অনটনে কাটে দিন। ন্যায্যমূল্যর চাল-আটা কিনতে পারলে কয়েক দিন ভালো যায়। 
 
গতকাল শনিবার কথা হয় ফরিদা খাতুনের সঙ্গে। এসময় তার মনে যেন কষ্টের সুর বেজে উঠে। তিনি বললেন, ‘সকাল সকাল লাইনে না ধরলে চাল-আটা পাওয়া যায় না। তাই কাজ-কর্ম ফেলে লাইনে দাঁড়াতে হয়। একটু দেরি হলে বলে শেষ হয়ে গেছে।’
 
তবে ন্যায্যমূল্যের এই চাল-আটার ‘মান’ নিয়ে ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করেন ফরিদা খাতুন। তিনি বললেন, ‘মাঝে-মধ্যে চালের মান খুবই খারাপ হয়। সেই চালে রান্না করা ভাত খাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবুও খেতে হয়।’ কী ধরনের খারাপ হয়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চালগুলো আধা শুকনো পড়ে। ভাত রান্না করলে  নরম হয়ে যায়।’
 
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে ৪১ জন ডিলার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চাল ও আটা বিতরণ করেন। ডিলাররা দৈনিক এক টন চাল ও এক টন আটা বিক্রি করেন। প্রতিকেজি চাল ৩০ টাকা ও প্রতিকেজি আটা ২৪ টাকা দরে মানুষের কাছে বিক্রি করেন। প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে তদারকি কর্মকর্তা রয়েছেন।
 
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (কারিগরি) রাজীব কুমার দে। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘একজন ভোক্তা ৫ কেজি করে চাল ও আটা কিনতে পারবেন।’
 
 
গত বছরের জুন মাসে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়। জুলাই মাস থেকে ওএমএসের চাল-আটা বিক্রি কার্যক্রম শুরু হয়। ডিলার নিয়োগে খাদ্য পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। 
 
চালের মান নিয়ে প্রশ্ন:   নগরীর মোহরা ও কোরবানিগঞ্জ এলাকায় চাল-আটা নিয়ে কথা হয় তিন নারীর সঙ্গে। তারা চালের মান নিয়ে অভিযোগ করেছেন। 
 
অভিযোগের সূত্র ধরে দুটি ডিলারকেন্দ্রে সরেজমিন দেখা হয়। তবে চালের মান মোটামুটি ভালো থাকলেও আটার মান খারাপ। দুই নারী আটার বিষয়ে বলেন, চালের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। আটা বিক্রি কম হয়। তাই আটা বাইরে বিক্রি করে দেন ডিলাররা। 
তাদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রাজীব কুমার দে বলেন, একেক সময় একেক ধরনের চাল বিতরণ করা হয়। আমদানি করা চালের মান ভালো হয়। আর দেশি (বোরো) চালের মান মোটামুটি।    
 
বিলুপ্ত চুরি ঠেকানো বিশেষ কমিটি: ওএমএসের চাল-আটা চুরি ও গোঁজামিলের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কর্মকর্তা-গুদাম কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব অনিয়ম চলে আসছিল। গত বছরের আগস্ট মাসে তৎকালীন আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক তদারকির জন্য ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করেছিলেন। ওই কমিটি নগরীর ২নং জালালাবাদ ওয়ার্ডে ওএমএসের চাল-আটা পাল্টিয়ে খাবার অনুপযোগী নিম্নমানের বিক্রি করার প্রমাণ পেয়েছিল। এছাড়া ১৫৩.৬৫০ কেজি চাল ও ১৩৮ কেজি আটা কম ছিল। পরে ২২নং এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের ডিলার মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজের দোকানে ১০০০ কেজি আটার বদলে ২৫০ কেজি আটা পাওয়া যায়। 
ওই সময়ে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এসএম কায়ছার আলী বলেছিলেন, ‘এসব চাল গরু-ছাগলে খাবারের অযোগ্য।’ চাল-আটা চুরির অভিযোগে দুই ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়।
 
 
প্রতিটনে গুনতে হয় এক হাজার টাকা: প্রতিটন চালে এক হাজার ও আটার জন্য এক হাজার করে প্রতিজন ডিলারকে দুই হাজার টাকা করে গুনতে হয়। সেই হিসাবে ৪১ জন ডিলারের কাছ থেকে দিনে ৮২ হাজার টাকা। সপ্তাহের ৫ দিন চাল-আটা বিক্রি। সেই হিসাবে দাঁড়ায় ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। মাসে ২০ দিনে ঘুষের পরিমাণ হয় ৮২ লাখ টাকা। হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য দেওয়া ওএমএস’র চাল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চালবাজি চলে আসছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য কর্মকর্তা রাজীব কুমার দে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’
 
পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট