‘নৌকোর খোল ভরিয়া মৃত সাদা ইলিশ মাছ। লণ্ঠনের আলোয় মাছের আঁশ চকমক করে। মাছের নিষ্পলক চোখগুলিকে স্বচ্ছ নীলাভ মণির মতো দেখায়।’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের শুরুতেই ইলিশের এমন জীবন্ত ছবি। নদী, জেলে আর ইলিশ- বাংলার এই চিরচেনা সম্পর্কের গল্প বহু পুরোনো। তবে ইলিশের জীবন নদীতে ধরা পড়া আর রান্নার হাঁড়িতে পৌঁছানোতেই শেষ হয় না। লবণ আর সময়ের হাত ধরে তার জন্ম নেয় আরেক জীবন, যার নাম ‘নোনা ইলিশ’।
কিন্তু সেই নোনা ইলিশ তৈরির প্রক্রিয়ায় এখন বদল এসেছে। মাছের পেট থেকে বের করা ডিম আর আগের মতো নোনা করা হচ্ছে না। বাড়তি দামের কারণে ডিম আলাদা করে কাঁচাই বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে একসময়কার পরিচিত পণ্য নোনা ডিম ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বাজার থেকে। চট্টগ্রামের বৃহত্তম শুঁটকিপট্টি আছদগঞ্জে এখন নোনা ডিমের দেখা মেলাই ভার।
চট্টগ্রামের সাগরপাড়ে বংশপরম্পরায় নোনা ইলিশ তৈরির চল রয়েছে। গত এক যুগে চাহিদা বাড়ায় মাছ ও শুঁটকি ব্যবসায়ীরাও বাণিজ্যিকভাবে এ মাছ প্রক্রিয়াজাত করছেন। নগরের দক্ষিণ কাট্টলী ও ফিশারিঘাট এলাকায় গড়ে উঠেছে নোনা ইলিশের বহু গুদাম। পাশাপাশি আনোয়ারার গহিরাসহ উপক‚লের বিভিন্ন ঘাটে তৈরি হচ্ছে নোনা ইলিশ। তবে মাছের সঙ্গে ডিম নোনা করার পুরোনো রীতিতে ছেদ পড়ছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ইলিশের ডিমের দাম উঠেছে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। গত বছর একই ডিমের দাম ছিল কেজিপ্রতি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। দামের এই ঊর্ধ্বগতিতে ইলিশ থেকে ডিম আলাদা করে কাঁচা বিক্রির প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইনেও ইলিশের ডিমের প্রচার ও বিক্রি বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয়েছে এ পণ্যের ক্রেতা। ফলে ডিম নোনা করে সংরক্ষণের বদলে দ্রæত কাঁচা বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিতে চাইছেন ব্যবসায়ীরা।
কাট্টলী ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে নোনা ইলিশ তৈরির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক আজিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রথমে মাছের আঁশ পরিষ্কার করে নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়। ছোট মাছ পিঠ বরাবর দুই ফালি করে কেটে মাঝখানে লবণ দেওয়া হয়। বড় মাছ বিশেষ বঁটি দিয়ে দুই পাশে ফালি করে লবণ মাখিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়। আগে মাছের পাশাপাশি ডিমও একই প্রক্রিয়ায় নোনা করা হতো। এখন ডিমের দাম বেশি হওয়ায় তা আলাদা করে কাঁচা বিক্রি করা হচ্ছে।’
আনোয়ারার গহিরার উঠানমাঝির ঘাটেও নোনা ইলিশ বিক্রি হয়। সেখানকার আড়তদার মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ‘আমাদের ঘাটে মূলত ছোট ইলিশ নোনা করা হয়। আগে মাছের সঙ্গে ডিমও নোনা করা হতো। এখন কাঁচা ডিমের চাহিদা বেড়েছে। তাই ডিম আলাদা করে বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে পাইকারি দামে প্রতি কেজি কাঁচা ডিম ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, সাধারণত চার থেকে ছয়টি ইলিশের ডিমে এক কেজি হয়। তবে মাছের আকারভেদে এ হিসাব কমবেশি হতে পারে। অন্যদিকে এক কেজি নোনা ডিম তৈরি করতে ১০ থেকে ১৫টি ইলিশের ডিম লাগে। নোনা ডিমের দাম কেজিপ্রতি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ, কাঁচা ডিম বিক্রি করে যে আয় পাওয়া যায়, নোনা ডিম তৈরির পর তা বিক্রি করে একই রকম আয় নিশ্চিত করা যায় না। বরং নোনা ডিম তৈরিতে বেশি ডিমের প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ, শ্রম এবং গুদামজাত করে রাখার ব্যয়। সংরক্ষণের জন্য সময়ও দিতে হয়। সব মিলিয়ে কাঁচা ডিমের চড়া দাম ও চাহিদার কারণে ডিম নোনা করার বদলে সরাসরি বিক্রিই ব্যবসায়ীদের কাছে লাভজনক হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের আছদগঞ্জ শুঁটকিপট্টির ৪৫টি আড়ত ও ২৮০টি পাইকারি দোকানে অন্যান্য শুঁটকির পাশাপাশি নোনা ইলিশ বিক্রি হয়। একসময় সেখানে নোনা ডিমও পাওয়া যেত। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য দেখা যায় না।
আছদগঞ্জের ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রাম শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবু নাছের পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমাদের বাজারে এখন নোনা ডিম নেই বললেই চলে। আগে নোনা ডিম কেজিপ্রতি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো। এখন ডিম আসছে না। প্রস্তুতকারকেরা সেগুলো আলাদা করে কাঁচা বিক্রি করছেন। কেননা কাঁচা ডিমের দাম এখন অনেক, চাহিদাও প্রচুর।’
নোনা ইলিশ তৈরির পুরোনো রীতি এখনো টিকে আছে, তবে সেই প্রক্রিয়া থেকে ক্রমেই বাদ পড়ছে ইলিশের ডিম। একসময় মাছের সঙ্গে লবণ মেখে সংরক্ষণ করা হতো যে ডিম, বাড়তি দামের কারণে এখন তা আলাদা করে বিক্রি হচ্ছে কাঁচাই। এতে ব্যবসায়ীদের মুনাফার পাল্লা ভারী হচ্ছে বটে, তবে হারিয়ে যাচ্ছে নোনা ডিম নামের ঐতিহ্যবাহী এই খাবার।
পূর্বকোণ/নুসরাত



















