চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

নোনা বাতাসে শতবর্ষের ঘ্রাণ

আছদগঞ্জের শতবর্ষী শুঁটকি সাম্রাজ্য

নোনা বাতাসে শতবর্ষের ঘ্রাণ

নাজিম মুহাম্মদ 

৯ অক্টোবর, ২০২৬ | ২:১৭ অপরাহ্ণ

ভোরের কুয়াশা চিরে আলো ফোটার আগেই চাক্তাই খালের মোহনা আর কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র নোনতা ঘ্রাণ। ঘাটে নোঙর করা ট্রলার, ইঞ্জিনচালিত দেশি বোট এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা বড় বড় ট্রাক থেকে বাঁশের ঝাঁপি ও বস্তাভর্তি শুঁটকি নামাতে ব্যস্ত শ্রমিক। কারও মাথায় শুঁটকির ভারী বস্তা, আড়তগুলোতে চলছে পাইকারদের হাঁকডাক, আবার কোথাও শুঁটকি প্যাকেটজাতকরণের ধুম। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের শতবর্ষী বাণিজ্যিক হৃৎপিণ্ড ঐতিহ্যবাহী আছদগঞ্জ শুঁটকি পট্টিতে প্রতি শনিবার ভোর বেলার দৃশ্য এটি। 
 
চট্টগ্রাম শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবু নাছের জানান, সবেমাত্র শুরু হয়েছে শুঁটকির মৌসুম। চলবে আগামী এপ্রিল পর্যন্ত। তিনি জানান- পুরো বছরে প্রায় তিন কোটি কেজি শুঁটকি বিক্রি হয়। প্রতি কেজি ৪০০ টাকা হলেও বছরে ১২০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। সে হিসাবে প্রতিমাসে ১০০ কোটি টাকা শুঁটকির বাজারে লেনদেন হয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের  বিভিন্ন জেলা এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের শুঁটকির চাহিদা মেটাতে আছদগঞ্জ এখনও দেশের শুঁটকি বাণিজ্যের প্রধান ভরসাস্থল।    
 
আছদগঞ্জের বাজারে সপ্তাহের প্রতিদিন স্বাভাবিক বেচাকেনা হলেও শনিবার ও মঙ্গলবার হলো সাপ্তাহিক বাজারবার। ভোর হওয়ার আগেই ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, উত্তরবঙ্গ এবং রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি তিন পার্বত্য জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে ভিড় জমান। দেশের শুঁটকি বাণিজ্যের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী এই পাইকারি মোকামে বর্তমানে ৪৫টি আড়ত এবং ২৮০টি পাইকারি দোকান রয়েছে। দেশের  বিভিন্ন উপকূলীয় মোকাম থেকে শুঁটকির চালানগুলো প্রথমে এসব আড়তে এসে পৌঁছায়। এরপর আড়ত থেকে কমিশন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নিয়ে যায় পাইকারি দোকানদাররা। তবে এই শুঁটকি ব্যবসার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- ব্যবসা পরিচালনায়  বেশি মূলধন বিনিয়োগ করতে হয়।
 
ব্যবসায়ীরা জানান, শুঁটকি বিক্রির সিংহভাগ লেনদেনই সম্পন্ন হয় বাকিতে। স্থানীয় পাইকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতা-সব পর্যায়ে দীর্ঘদিন বাকিতে কেনাবেচার রেওয়াজ চালু রয়েছে। ফলে আড়তদার ও পাইকারদের লাখ লাখ টাকার মূলধন মাসের পর মাস বাজারে আটকে থাকে। শুঁটকির নতুন চালান কেনা ও সরবরাহ সচল রাখতে প্রতিনিয়ত বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ধরে রাখতে হয়।
 
ব্যবসায়ীরা জানান, আছদগঞ্জে শুঁটকির সবচেয়ে বড় চালান আসে দেশের প্রধান শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে। এছাড়া টেকনাফ, সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, খুলনার সুন্দরবন  সংলগ্ন দুবলার চর এবং পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপক‚ল থেকে প্রচুর সামুদ্রিক মাছের শুঁটকি নিয়মিত আছদগঞ্জে আসে। তবে কেবল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়ে দেশের শুঁটকির চাহিদা মেটানো সম্ভব নয় বলে জানান আড়তদাররা। তারা জানান, পাকিস্তান, ভারত, মালেশিয়া ও মিয়ানমার থেকে শুঁটকি আমদানি হয়। সবচেয়ে বেশি শুঁটকি আসে ভারত ও মিয়ানমার থেকে।  
 
বাজারে আসা মাছের আকার, শুষ্কতা ও গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে শুঁটকির পাইকারি দরে রয়েছে বেশ বৈচিত্র্য। আছদগঞ্জের পাইকারি বাজারে বর্তমানে শুঁটকির মধ্যে প্রতি কেজি হিসাবে লইট্যা বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ থেকে ১৫০০ টাকায়। ছোট ও বড় সাইজভেদে ছুরি শুঁটকি  ৬০০ থেকে ২০০০, রূপচাঁদা শুঁটকি ২০০০ থেকে ৫০০০, বড় সাইজের লাল চিংড়ি ১৬০০ থেকে ২৫০০, এবং ছোট চিংড়ি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।  সবচেয়ে দামি লাক্ষা শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৫০০ থেকে ৫৫০০ টাকায়। এছাড়া ফাইস্যা ৩০০ থেকে ১০০০, মইল্ল্যা ৬০০ থেকে ৮৫০, পাত্তারা ৮০০ থেকে ১২০০, এবং নোনা ইলিশ আকারভেদে প্রতি পিস ৩০ থেকে ১২০০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। অন্যদিকে মিঠা পানির শুঁটকির মধ্যে প্রতি কেজি দেশি শোল বিক্রি হচ্ছে ১০০০, বোয়াল ৭০০ থেকে ৮০০, বাইম ১৫০০ থেকে ১৬০০, পুঁটি ৫০০ থেকে ৬০০ এবং টেংরা শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।
 
শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবু নাছের বলেন, শুঁটকির মৌসুম সবেমাত্র শুরু হয়েছে। নভেম্বর মাস থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুঁটকির ভরা মৌসুম। ওই সময় বাজার জমে উঠে বেশি। তিনি বলেন, শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য ব্যবসায়ীরা নগরীর মাঝিরঘাট, দুই নম্বর গেট, বায়েজিদ এবং চন্দনাইশের দোহাজারীসহ বিভিন্ন এলাকার হিমাগার ব্যবহার করছেন। এসব হিমাগারে প্রতি কেজি শুঁটকি সংরক্ষণে দিনে প্রতি কেজি ১৮ থেকে ২০ পয়সা ভাড়া গুনতে হয়। তবে আধুনিক হিমাগারের সুবিধা বাড়লেও মোকামে শুঁটকির সার্বিক সরবরাহ আগের তুলনায় কমে গেছে। সাগরে মাছের সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে আছদগঞ্জের মোকামে।
 
বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আড়তে কাজ করা আছদগঞ্জ দোকান কর্মচারী সমিতির সভাপতি আবু তাহের বলেন, শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বেড়েছে, ডিজেলসহ জ্বালানি তেলের দামও বাড়তি। অথচ সাগরে জাল ফেলে আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে মাঠপর্যায়ে উৎপাদন কিছুটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতা, বাকি লেনদেনের আর্থিক ঝুঁকি এবং কাঁচা মাছের টানাপোড়েন সত্তে্বও এখনো টিকে আছে শতবর্ষের ঐতিহ্য আছদগঞ্জের এই শুঁটকির বাজার।
 
পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট