চলতি বছরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ধরে প্রস্তুতি গুছিয়ে নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে শেষপর্যন্ত চলতি বছর নির্বাচন থেকে সরে আসে ইসি। এবার আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে, একইভাবে সরকারি দল বিএনপিও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের কার্যক্রম শুরু করেছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি আগে-ভাগেই এই কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে প্রার্থী বাছাই নিয়ে দক্ষিণ জেলা বিএনপি ও সংশ্লিষ্ট আসনগুলোর সংসদ সদস্যদের মধ্যে তীব্র বিরোধ শুরু হয়। এতে দলীয়ভাবে একক প্রার্থী নির্ধারণে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ১৫ টি পৌরসভার মধ্যে ১৪টি নির্বাচনের উপযোগী রয়েছে। সীমানা জটিলতার কারণে একটি নির্বাচনের উপযোগী নেই। ১৬ উপজেলার মধ্যে সবকটি নির্বাচনের উপযোগী রয়েছে। ১৯১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ১৮৯টি নির্বাচন করা যাবে। নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ১০ আগস্ট ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। পরে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়।
ইসির তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ৬৭ লাখ ২৬ হাজার ৬৯৬ জন। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের ভোটার সংখ্যা ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ৯০৫ জন। সিটি করপোরেশনের ৪১ ওয়ার্ডে ৭২৫টি ভোটকেন্দ্রের বিপরীতে ৩ হাজার ৯৫৭টি কক্ষ রয়েছে। ১৬ উপজেলায় ১৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদে মোট ভোটার রয়েছে ৪২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬৯ জন। তালিকায় ১ হাজার ৭৮১টি ভোটকেন্দ্র ও ৮ হাজার ১৫৩টি ভোটকক্ষ রয়েছে। ১৪ পৌরসভায় মোট ভোটার রয়েছে ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৫৮৭ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২১৯টি। ভোটকক্ষ ১ হাজার ৯৫টি।
ইসি সূত্র জানায়, চলতি বছরের শেষ দিকে ইউপি নির্বাচন শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বর মাসে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আপত্তির কারণে তা থেকে সরে আসে ইসি। এখন আগামী বছরের জানুয়ারি মাস ঘিরে নতুন করে প্রস্তুতি চলছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বশির আহমদ বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যখন যে নির্দেশনা দেবে, সেইভাবে আমরা কাজ শুরু করবো।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে জেলার গ্রাম-গঞ্জে সরব হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন বিএনপিদলীয় প্রার্থীরা মাঠে-ঘাটে জোরালো প্রচার শুরু করেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে শুরু করে সামাজিক অনুষ্ঠানে ঘন ঘন যোগদান করে নিজেদের প্রার্থিতার কথা জানান দিচ্ছেন। ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে দোয়া নিচ্ছেন।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গ্রামাঞ্চলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। জনসমাগম এলাকায় সাঁটানো হয়েছে পোস্টার-ব্যানার ও বিলবোর্ড। সম্ভাব্য প্রার্থী ছাড়াও পছন্দনীয় নেতা-প্রার্থীর পক্ষে পোস্টার-ব্যানার সাঁটিয়েছে কর্মী-সমর্থকেরা। প্রচারে আরও এক ধাপ এগিয়ে চলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বিএনপিতে একক প্রার্থীর নির্দেশ: গত ৯ আগস্ট চট্টগ্রাম সফর করে গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নগরীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে চট্টগ্রামের তিন সাংগঠনিক ইউনিট (চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা) নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি ও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন।
একক প্রার্থিতার চ্যালেঞ্জ: দলীয়ভাবে একক প্রার্থী করানোর নির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিন্তু চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি ইতিমধ্যেই দলীয় প্রার্থিতা বাছাই কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। জেলা কমিটির সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে ‘সার্চ কমিটি’। ইতিমধ্যেই উপজেলায় ইউনিয়নভিত্তিক বায়োডাটা সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা বিএনপি। সংসদ সদস্যদের বাদ দিয়ে এই সার্চ কমিটি গঠনে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ নিয়ে জেলা বিএনপি ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি ও সংসদ সদস্যরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘দলীয় প্রার্থী বাছাই কী শুধু দক্ষিণ জেলা বিএনপিকে দিয়েছে। এটা পলিটিক্যাল স্ট্যান্ডবাজি। এর মাধ্যমে হাইব্রিডদের দৌরাত্ম্য ও অবস্থান পাকাপোক্ত করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের বাইরে রেখে প্রার্থী ঘোষণা সমীচীন হবে না। তাদেরও পছন্দ-অপছন্দ থাকাতে পারে। তাদের মতামতের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এখন তাদের গালিগালাজ করা হচ্ছে। তা দলের জন্য শোভনীয় নয়।’
দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া পূর্বকোণকে বলেন, ‘যাচাই-বাছাই কার্যক্রম প্রায় শেষপর্যায়ে। সংসদ সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে উপজেলাভিত্তিক বাছাইয়ের পর তালিকা জেলা কমিটিকে জমা দেবেন। তারপর ২-৩ জনের তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হবে।’
পূর্বকোণ/ইবনুর


















