চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

চসিকে মধ্যরাতে গুঞ্জন-পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, ধোঁয়াশা

খুলশীতে বগাকাণ্ড: চসিকে মধ্যরাতে গুঞ্জন-পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, ধোঁয়াশা

নাজিম মুহাম্মদ

৮ অক্টোবর, ২০২৬ | ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) কার্যালয়ে গত মঙ্গলবার রাতে ‘কিশোর গ্যাং’ নেতা ওয়াকিল হোসেন বগাকে আশ্রয় এবং মেয়রের নিজস্ব গাড়িতে করে তাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। 
 
 
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি), খুলশী থানা পুলিশ এবং ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ওয়াকিল হোসেন বগার পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অবস্থান আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে মেয়র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে একে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার ষড়যন্ত্র বলছেন, অন্যদিকে পুলিশ দাবি করছে তাদের উপস্থিতি ছিল একটি সাধারণ নিয়মিত অভিযানের অংশ। আবার পুরো ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ওয়াকিল হোসেন ব্যক্তিগত শত্রু তা ও সাজানো মামলার অভিযোগ এনেছেন ওসির বিরুদ্ধে।
 
 
মঙ্গলবার রাতে চসিক কার্যালয়ে বগাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে মেয়রের গাড়িতে করে বের করে দেওয়ার যে তথ্য ছড়িয়েছে, তার প্রতিবাদ জানিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, কোনো সাংবাদিক বা ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে ওয়াকিল আমার গাড়িতে উঠে চলে গেছেন, তবে আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি ছেড়ে দেব।
 
 
মেয়র বলেন, সিটি কর্পোরেশন কোনো নির্দিষ্ট দলীয় কার্যালয় নয়। এটি জনগণের একটি উন্মুক্ত সেবা প্রতিষ্ঠান। নগরপিতা হিসেবে তিনি কোনো দল বা বিশেষ গোষ্ঠীর নন, বরং নগরীর আপামর জনসাধারণের অভিভাবক। ফলে নাগরিক সমস্যা নিয়ে যে কারও সেখানে প্রবেশের অধিকার রয়েছে।
 
 
 
মেয়র বলেন, ওয়াকিল নিজে তার কার্যালয়ে আসেনি। তবে ওয়াকিলের দুই ভাই খুলশী থানার ওসি মো. আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ ও হয়রানির প্রতিকার চাইতে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন।
 
 
মেয়র বলেন, চসিকের কার্যালয় ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারির আওতাভুক্ত। বগা তার গাড়িতে উঠেছেন এবং কোনো ফুটেজেই এমন কোনো দৃশ্য পাওয়া যাবেনা। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের সঙ্গে যোগসাজশ করে তার সম্মানহানি করতেই পুলিশ ও কিছু মহল ষড়ষন্ত্র করছে।
 
 
ওয়াকিলকে কথিত সন্ত্রাসী তকমা দেওয়ার বিরোধিতা করে ডা. শাহাদাত বলেন, ওয়াকিল কোনো নিষিদ্ধ বা সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য নন। বিগত ১৭-১৮ বছর ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির একজন যোদ্ধা।
 
 
খুলশী এলাকায় ‘হৃদয়’ নামের এক কিশোর হত্যাকা তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তোলেন মেয়র। তিনি দাবি করেন, এ হত্যাকান্ডরে ঘটনায় মূল অভিযুক্ত কামরুলকে শারীরিক নির্যাতন ও বলপ্রয়োগ করে পুলিশ স্বীকারোক্তি আদায়ে বাধ্য করেছে। ওসি আব্দুর রহিম ও এক উপপরিদর্শক পরিকল্পিতভাবে চাপ সৃষ্টি করে ওয়াকিল ও তার ভাইয়ের নাম মামলার এজাহারে যুক্ত করিয়েছেন। অথচ প্রত্যক্ষদর্শী মোরশেদ এবং স্বয়ং মামলার বাদীও স্পষ্ট জানিয়েছেন যে ওয়াকিল এই হত্যাকান্ডরে সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন। মূলত স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের সক্রিয় নেতাকর্মীদের এলাকা ছাড়া করতেই এই সাজানো মামলা দেওয়া হয়েছে।
 
 
খুলশী থানার ওসির অতীত ভ‚মিকার কড়া সমালোচনা করে মেয়র প্রশ্ন তোলেন, ওসি আব্দুর রহিম বিগত সরকারের সময় বাকলিয়া থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালনকালে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর নির্মম নিপীড়ন চালিয়েছিলেন। এমনকি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীর মেজবানের খাবারের ডেকচি পর্যন্ত লাথি মেরে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই বিতর্কিত কর্মকর্তা কীভাবে এখনও খুলশী থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ওসির চেয়ারে বহাল থাকেন? তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমান ওসি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে খুলশী এলাকায় চিহ্নিত কোনো আওয়ামী লীগ, যুবলীগ কিংবা ছাত্রলীগের অপরাধীকে আইনের আওতায় আনেননি।
 
 
এদিকে মেয়র কার্যালয় ঘিরে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান বা ঘেরাওয়ের গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অমূলক দাবি করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) জানান, এটি কোনো অবস্থাতেই মেয়র ভবন কেন্দ্রিক অভিযান কিংবা বিশেষ কোনো ঘেরাও কর্মসূচি ছিল না। চিহ্নিত ও পরোয়ানাভুক্ত আসামি ‘বগা’কে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পুলিশের একটি নিয়মিত দল মতিঝর্ণা এলাকার দিকে যাচ্ছিল। মতিঝর্ণায় যাওয়ার মূল রাস্তাটি মেয়রের কার্যালয়ের সম্মুখভাগ দিয়ে প্রসারিত হওয়ায় পুলিশ স্বাভাবিক পথ হিসেবেই তা অতিক্রম করেছে। তিনি বলেন, মতিঝর্ণার দিকে যেতে হলে মেয়রের কার্যালয়ের সামনে দিয়েই যেতে হয়। পুলিশ কি এখন দায়িত্ব পালনের সময় কোনো অফিসের সামনের সরকারি সড়ক দিয়ে যাতায়াতও করতে পারবে না? একটি অত্যন্ত সাধারণ ও স্বাভাবিক বিষয়কে তিলকে তাল বানিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চক্রান্ত হচ্ছে। নিজের বিরুদ্ধে চসিক মেয়রের আনা অভিযোগের জবাবে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুর রহিম বলেন, মঙ্গলবার ও বুধবার তিনি দাপ্তরিক ছুটিতে রয়েছেন। ফলে মঙ্গলবার রাতের তথাকথিত পুলিশি অবস্থান বা অভিযান সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি অবগত নন। 
 
 
বিগত সরকারের আমলে বাকলিয়া থানায় দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও নেতাকর্মীদের হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি বলেন, বাকলিয়া থানায় দায়িত্ব পালনকালে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আমি সর্বদা সরকারি বিধি মেনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছি। রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি জানান, দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ গত এক সপ্তাহেই নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অন্তত ১২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করেছে খুলশী থানা পুলিশ।
 
 
 
চসিক কার্যালয়ে যাওয়া কিংবা মেয়রের গাড়িতে চড়ে পালিয়ে যাওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন আলোচিত ওয়াকিল হোসেন বগা। তিনি জানান, পুলিশের হয়রানি ও পারিবারিক সংকটের বিষয়ে মেয়রের সাহায্য চাইতে তার ভাই গিয়েছিলেন, তিনি নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পুলিশের সঙ্গে বিরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াকিল দাবি করেন, পাহাড়তলী কলেজের শিক্ষক মিজান ও অধ্যক্ষের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে বাগবিতন্ডা হয়েছিল। সেখানে ছাত্রদলের কয়েকজন তরুণ উপস্থিত ছিল। কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই বা প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই ওসি রহিম ওয়াকিলের রাজনৈতিক সহযোগীরা সেখানে উপস্থিত থাকার অজুহাতে সরাসরি তার নামে একটি চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করেন। ওয়াকিল বলেন, অন্যায়ভাবে মামলা দেওয়ায় তিনি মাথা গরম করে ওসির সঙ্গে ফোনে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন এবং রাগের মাথায় কিছু অশালীন বাক্য প্রয়োগ করেন। কিন্তু ওসি পুরো ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট গোপন রেখে শুধুমাত্র ওয়াকিলের গালিগালাজের অডিও ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে ওসি তার বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর ও তান্ডব চালান। কিশোর গ্যাং ও হৃদয় হত্যাকান্ডে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের সম্পৃক্ততার অভিযোগও নাকচ করে ওয়াকিল বলেন, আমার কোনো কিশোর গ্যাং নেই। 
 
পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট