নগরীর খুলশী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, এ এলাকায় কিশোরদের কয়েকটি গ্রুপের পেছনে প্রভাবশালী ‘বড় ভাইদের’ ভূমিকা রয়েছে। দুই কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারে গত ২৯ সেপ্টেম্বর হৃদয় নামে ১৫ বছরের এক কিশোর নিহত হয়। এ ঘটনার পর খুলশীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। তাদের মধ্যে আলোচনায় এসেছে ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগার নাম।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বগা নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং বর্তমানে বহিষ্কৃত। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক ও জমি দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে।
কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ: খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় ‘সেভেন স্টার’ ও ‘ফাইভ স্টার’ নামে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধে কিশোর মোহাম্মদ হৃদয় নিহত হয়। এ ঘটনায় সক্রিয় দুই কিশোর গ্যাংয়ের ঘটনাটি সামনে আসে। পুলিশ জানায়, হৃদয়কে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আটজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে আসিফ, জীবন ও তামিন নামে তিন কিশোর হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। কিশোর হৃদয় হত্যার ঘটনায় তার চাচা মো. ইমান আলি বাদী হয়ে খুলশী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। যাদের সবার বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, হৃদয় হত্যায় জড়িত মামলার আসামিরা চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক ওয়াকিল হোসেন বগা ও তার ছোট ভাই রকি হোসেন পিচ্চির নেতৃত্বাধীন সেভেন স্টার গ্রুপের সদস্য।
পুলিশ জানায়, নিহত হৃদয়সহ সংশ্লিষ্ট কিশোরদের একটি অংশ বগার নিয়ন্ত্রণাধীন ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে পুলিশ বগাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালায়। ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে এবং তাদের পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর বগাকে গ্রেপ্তার করতে খুলশীর ওয়্যারলেস মোড় এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের দাবি, ওই সময় বগার অনুসারীরা সড়ক অবরোধ করে এবং পুলিশের ওপর ইট-পাথর নিক্ষেপ করে। এতে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় খুলশী থানার এসআই মো. শাহ পরাণ বাদী হয়ে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ওয়াকিল হোসেন বগাকে প্রধান করে ২১ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয় হয়।
খুলশী থানার পরিদর্শক (ওসি) আবদুর রহিম জানান, ওয়াকিল হোসেন বগার বিরুদ্ধে ২১ ও তার ভাই রকি হোসেন পিচ্চির বিরুদ্ধে থানায় ১০ টি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি দুই কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধে নিহত কিশোর হৃদয় হত্যায় জড়িত সেভেন স্টার নামে যে কিশোর গ্যাং রয়েছে সেটির নিয়ন্ত্রণ করেন বগা ও তার ভাই রকি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়ে গ্রেপ্তার আসামিরা বিজ্ঞ আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। ইতিমধ্যে বগার বেশ কয়েকজন সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছে। বগাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
কলেজ শিক্ষককে নির্যাতন: গত ২৯ আগস্ট মিজানুর রহমান নামে পাহাড়তলী কলেজের এক শিক্ষককে ‘টর্চার সেলে’ নিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করেছে ওয়াকিল হোসেন বগা। মিজানুর ওই কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক। এ ঘটনায় পাহাড়তলী কলেজের অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদারসহ সাত জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ৪/৫ জনকে আসামি করে নগরীর খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন, পাহাড়তলী কলেজের অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদার (৫৫), ওয়াকিল হোসেন বগা (৪২), ফয়সাল ওরফে মুরগী ফয়সাল (৩২), ইমন (২৪), সাজিদ (১৮), সালাহ উদ্দিন কাদের (৪৫) ও মনির আহমদ (৫৮)।
এজাহারে বলা হয়েছে, প্রভাষক মিজানুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়তলী কলেজের বিভিন্ন অনিয়ম ও অধ্যক্ষের অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন, যার প্রেক্ষিতে শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা অধিদপ্তর তদন্ত চালাচ্ছিল। গত ২৪ আগস্ট তিনি কলেজ ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে গণমাধ্যমের কাছে অধ্যক্ষ্যের নানা অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। এর জেরে ২৯ আগস্ট পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন অধ্যক্ষ। অভিযোগে বলা হয়, গত ২৯ আগস্ট বিকেল সোয়া চারটায় অধ্যক্ষ্যের নির্দেশে প্রভাষক মিজানের আবাসিক কক্ষে আসামিরা জোরপূর্বক প্রবেশ করে জিনিসপত্র তছনছ করে এবং নগদ ১২ হাজার টাকা লুটে নেয়। পরে বিকেল সাড়ে চারটায় তাঁকে জোরপূর্বক অপহরণ করে ওয়াকিল হোসেন বগার ওয়ারলেসস্থ দুই নম্বর লেনের একটি টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। শিক্ষক মিজানকে টর্চার সেলে আটকে রেখে অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদারকে ভিডিও কল দেওয়া হয়। ভিডিও কলে অধ্যক্ষ ওই শিক্ষককে মেরে ফেলার নির্দেশ দিলে কল চালু রেখেই বগাসহ অন্য আসামিরা লোহার রড, হাতুড়ি ও হকিস্টিক দিয়ে শিক্ষককে বেধড়ক পেটাতে থাকে। বেধড়ক পিটুনিতে শিক্ষক মিজানের ডান হাতের আঙ্গুল ভেঙে যায় এবং পিঠসহ সারা শরীরে গুরুতর জখম হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে মুখে ও কানে রড ঢুকিয়ে আঘাত করা হয়। এরপর তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হয় যে, চাকরি করতে হলে সব অভিযোগ প্রত্যাহার করতে হবে এবং পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ দিতে হবে। এ সময় তার একটি সাজানো ভিডিও জবানবন্দি ধারণ করা হয় এবং ৩০০ টাকার ফাঁকা স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে সন্ধ্যা সাতটার দিকে তাকে অচেতন অবস্থায় ওয়ারলেস মোড়ে ফেলে রেখে আসামিরা পালিয়ে যায়। স্থানীয় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে জানতে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় ওয়াকিল হোসেন বগার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।
পূর্বকোণ/এএইচ

















