মালবাহী ট্রেনটি তখন দাঁড়িয়ে ছিল চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলস্টেশনে। প্ল্যাটফর্মের পাশে খেলছিল কয়েকজন শিশু। তাদের সঙ্গে ছিল ছোট্ট হৃদয়ও। বয়স কতই বা-চার কিংবা পাঁচ বছর। খেলতে খেলতে অন্য শিশুদের সঙ্গে উঠে পড়েছিল দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের একটি বগিতে। হঠাৎ বেজে উঠল হুইসেল। ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল ট্রেন। অন্য শিশুরা কোনোভাবে নেমে যেতে পারলেও হৃদয় আর নামতে পারেনি। মুহূর্তেই প্ল্যাটফর্মটি পিছিয়ে যেতে লাগল। যে জায়গায় ছিল তার ঘর, বাবা-মা, পরিচিত মানুষ সবকিছুই চোখের সামনে থেকে দূরে সরে যেতে লাগল।
কয়েক ঘণ্টা পর ট্রেনটি থামল কুমিল্লা রেলস্টেশনে। ভয়ে ভয়ে ট্রেন থেকে নামল হৃদয়। সেখানেই যেন থেমে গেল তার শৈশব। সেদিনের সেই ছোট্ট ভুলের মাশুল আজও দিয়ে যাচ্ছেন ২৩ বছরের এই তরুণ। মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় ১৮ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে আর দেখা হয়নি বাবা-মায়ের মুখ। ফিরে যাওয়া হয়নি সেই ঘরেও। হৃদয়ের মনে থাকা শৈশবের স্মৃতিও খুব বেশি নয়। বাবার নাম মোহাম্মদ কাশেম, মায়ের নাম বানুসা বেগম। পাহাড়তলী রেলস্টেশনের পাশেই থাকতেন তারা। জায়গাটি সম্ভবত রেলের জায়গা ছিল। বাবা বাইরে কাজ করতেন, মা থাকতেন ঘরে। কোনো ভাই-বোন ছিল না এটুকুও মনে আছে তার। এরপরের স্মৃতিগুলো যেন কুয়াশায় ঢাকা। কুমিল্লা রেলস্টেশনে পরিচিত কাউকে না পেয়ে কাঁদছিল হৃদয়। তা দেখে এক ব্যক্তি তাকে কাছে টেনে নেন। কিন্তু মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বদলে নিয়ে যান নিজের বাড়িতে। সেখানে তাকে দিয়ে করানো হতো বাড়ির কাজ। কাজে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই জুটত মারধর। এভাবে কেটে যায় পাঁচ-ছয় মাস। পরে ওই ব্যক্তি টাকার বিনিময়ে হৃদয়কে আরেকজনের কাছে দিয়ে দেন। শুরু হয় তার জীবনের আরেক অধ্যায়। নাঙ্গলকোট এলাকায় ওই ব্যক্তির বাড়িতে প্রায় ১০ বছর কাটে হৃদয়ের। সেখানে তাদের বেকারিতে কাজ করানো হতো তাকে। কিন্তু কোনো বেতন দেওয়া হতো না।
একপর্যায়ে ওই ব্যক্তির উদ্যোগেই মালয়েশিয়ায় থাকা তার এক ভাইয়ের কাছে পাঠানো হয় হৃদয়কে। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো জীবনে একটু স্বস্তি আসবে। কিন্তু সেখানেও শোষণ থেকে মুক্তি মেলেনি। একই প্রতিষ্ঠানে ওই ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করতেন হৃদয়। মাস শেষে বেতনের পুরো টাকাই নিয়ে নিতেন সেই ব্যক্তি।
পরে হৃদয়ের কষ্টের কথা জানতে পারেন প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা ওই ব্যক্তিকে চাকরি থেকে বের করে দেন এবং সতর্ক করেন হৃদয়ের কাছ থেকে আর টাকা চাইলে পুলিশে দেওয়া হবে।
নিজের জীবনের এসব দুঃখের কথা হারানো স্বজনদের খুঁজে দেওয়ার কাজ করা ফেসবুক পেজ ‘বঙ্গ ভিটার’ পর্দায় তুলে ধরেছেন হৃদয়। সেখানে তিনি লিখেছেন, ভুল করে ট্রেনে ওঠার মাশুল তাকে দিতে হচ্ছে ১৮ বছর ধরে। মানুষের বাড়ি, রুটির দোকান, হোটেলে কাজ করে কেটেছে তার জীবন। দিন শেষে মা-বাবার জন্য কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছেন কত রাত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতীতের টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোও ফিরে আসতে থাকে। মনে পড়ে পাহাড়তলী রেলস্টেশনের কথা। সেই স্টেশন, যেখানে খেলতে গিয়ে একদিন উঠে পড়েছিলেন ট্রেনে। যে ট্রেন তাকে নিয়ে গিয়েছিল অজানা এক জীবনের দিকে।
বাবা-মাকে খুঁজতে সাত-আট বছর আগে একবার পাহাড়তলী রেলস্টেশন এলাকায় ফিরে এসেছিলেন হৃদয়। পরিচিত জায়গাগুলোতে একা একা ঘুরেছেন। হয়তো কেউ চিনবে, হয়তো কেউ বলবে-কাশেম কোথায় থাকেন, বানুসা বেগম কোথায় আছেন। কিন্তু কাউকেই পাননি। হতাশ হয়ে ফিরে যান কুমিল্লায়।
এখন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে থাকেন হৃদয়। সেখান থেকে গতকাল রাতে পূর্বকোণের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। বললেন, ‘জানেন, খুব কষ্ট হয়। পৃথিবীতে কী এমন পোড়া কপাল নিয়ে এলাম! নিজের বাবা-মাকে পেয়েও হারিয়েছি, শুধু ভুল করে ট্রেনে উঠে পড়ায়। সাত-আট বছর আগে একবার বাবা-মায়ের খোঁজে পাহাড়তলী স্টেশন এলাকায় গিয়েছিলাম। একা একা অনেক খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি।’
কথার শেষে আবারও বাবা-মায়ের প্রসঙ্গ তুললেন হৃদয়। বললেন, ‘আমার বাবার নাম কাশেম, মায়ের নাম বানুসা বেগমএতটুকুই মনে আছে। বেঁচে থাকলে তাঁদের বয়স এখন পঞ্চাশের ঘরে হতে পারে। কেউ যদি তাঁদের খোঁজ দিতে পারেন, সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।’
একটি হুইসেল সেদিন ছোট্ট হৃদয়কে নিয়ে গিয়েছিল অচেনা এক জীবনের দিকে। ট্রেনটি কুমিল্লায় থেমেছিল কয়েক ঘণ্টা পর। কিন্তু হৃদয়ের জীবনে সেই যাত্রা থামেনি আজও। ১৮ বছর ধরে চোখের জলে বাবা-মায়ের স্মৃতি বুকে আগলে রেখেছেন হৃদয়। জীবন তাঁকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে, বদলে দিয়েছে চারপাশের সবকিছু। শুধু মুছে দিতে পারেনি সেই দুই মুখের অপেক্ষা। আজও তাঁর স্বপ্ন-একদিন বাবা-মায়ের মুখোমুখি হবেন। সেই একটি মুহূর্তের আশাতেই পথ চেয়ে আছেন হৃদয়। হয়তো বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার দিনই থামবে তাঁর ১৮ বছরের কান্না। কারণ, সেদিন যে ফুরাবে তার একজীবনের অপেক্ষা!
পূর্বকোণ/মিফতা

















