চট্টগ্রাম হচ্ছে বাণিজ্যিক রাজধানী ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী। বাণিজ্য ও শিল্পায়নের প্রসার ঘটেছে গ্রামীণ প্রান্তিক জনপদেও। এর প্রভাব পড়েছে কৃষিজমির ওপর। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়নের চাপ পড়েছে ফসলি জমি, নদী-খাল-জলাশয়ে। এতে কৃষি জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। এরফলে কমছে খাদ্য উৎপাদন, বাড়ছে খাদ্য-ঘাটতি।
এদিকে, চাষাবাদ বাড়াতে প্রতি মৌসুমে বড় অঙ্কের প্রণোদনা দিয়ে আসছে কৃষি অধিদপ্তর। সরকার বড় ধরনের ভর্তুকি দেওয়ার পরও বড় করা যাচ্ছে না চাষাবাদের আকার। গত ১৫ বছরের আমন আবাদ ও উৎপাদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একই বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে আমন আবাদ। চাষাবাদ ও উৎপাদনে তেমন পরিবর্তন হয়নি।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, ২০১০-১১ মৌসুমে আমনের আবাদ হয়েছিল এক লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে। ধান উৎপাদন হয়েছিল চার লাখ ২০ হাজার টন। এরপর থেকে নয় বছর চাষাবাদে অগ্রগতি বা পরিবর্তন হয়নি। ২০১৯-২০ মৌসুমে এক লাখ ৮২ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়। ধান উৎপাদন হয় ৫ লাখ ১৬ হাজার ৫৮৫ টন। পরের বছর (২০২০-২০২) চাষ হয় এক লাখ ৮৫ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে। কিন্তু আবাদ বাড়লেও কমে যায় উৎপাদন। ধান উৎপাদন হয় চার লাখ ৯৫ হাজার ৭৫৯ টন। এরপর আমন চাষের সূচক ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে নামতে থাকে। তবে চলতি মৌসুমে ২০২৫-২০২৬ সালে আমন চাষ হয় এক লাখ ৮৬ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে।
কমছে ফসলি জমি: ১৯৯৭ সালে কৃষি জরিপ অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ফসলি জমির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর। এরমধ্যে চাষাবাদের আওতায় ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমি। ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী চট্টগ্রামের ফসলি জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ২৩৫ হেক্টরে। ২০২০ সালে দাঁড়ায় দুই লাখ ৭ হাজার ৬৭২ হেক্টর।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, নগর-শিল্পায়নের ফলে ফসলি জমি ক্রমাগত কমছে। ইটের ভাটা, শিল্প-কারখানা, ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাটসহ নানা স্থাপনা নির্মাণের কারণে প্রতিবছর এক শতাংশ কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) প্রতিবেদন বলছে, দেশে বিভাগওয়ারি কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়ার প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি।
উৎপাদন চাহিদার অর্ধেক: খাদ্য অধিদপ্তরের ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে বছরে চালের চাহিদা হচ্ছে ১৬ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ টন। চাহিদার বিপরীতে ধান উৎপাদন হয় ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৫ টন। এই তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা (কারিগরি) রাজীব কুমার দে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজির নিরাপত্তার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে চলতি অর্থবছরে ৮২ হাজার ১০৭ টন চাল এবং ৩৪ হাজার ৮৩৮ টন গম বিতরণ করা হয়। অবশিষ্ট চাল বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে জোগান দেন আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা।
তবে কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, উৎপাদনের ১১ শতাংশের বেশি বীজও অপচয় হয়। মোট উৎপাদন থেকে আরও প্রায় এক লাখ টন চাল কমবে। সেই হিসাবে প্রকৃত খাদ্য উৎপাদন দাঁড়াবে সাড়ে ৬ লাখ টনের মতো।
প্রণোদনার ফল নেই: চাষাবাদের (ধান ও সবজি) আবাদ বাড়াতে বড় ধরনের প্রণোদনা দিয়ে আসছে সরকার। প্রতি বছর কৃষকদের বিনামূল্যে সার-বীজ দেওয়া হয়। এছাড়া ভর্তুকি মূল্যে কৃষি উপকরণও প্রদান করা হয়। তবে কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যে সরকারি প্রণোদনার প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কৃষকদের অভিযোগ, প্রণোদনার অর্থ কৃষি কর্মকর্তারা নানাভাবে নয়-ছয় করে। কৃষকেরা প্রকৃত প্রণোদনা পান না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, ‘জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কিছু কিছু এলাকায় পানি জমে থাকার কারণে চাষ করা সম্ভব হয় না। কারণ বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মিল-কারখানা স্থাপনের কারণে পানি চলাচল ও নিষ্কাশনের পথ বøক হয়ে পড়েছে।’
চাল আমদানি: চট্টগ্রামে খাদ্য ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর সরকারি-বেসরকারিভাবে ৩০ দশমিক ৭৩ টন চাল আমদানি করা হয়। একই সময়ে গম আমদানি হয় ১২২৭ দশমিক ১৯ টন। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারিভাবে চাল আমদানি হয়েছে ১২৬৮ দশমিক ৪৯ টন। একই সময়ে গম আমদানি হয়েছে ৭৩৩৩ দশমিক ৫৯ টন।
পূর্বকোণ/মিফতা

















