দুপুরে ভাত খাওয়ার পর হাঁটতে বেরিয়েছিলেন আনোয়ারা বেগম। প্রতিদিনের মতো সেদিনও হয়তো হাঁটাহাঁটি শেষে ঘরে ফিরবেন-এমনটাই ভেবেছিল পরিবার। কিন্তু ৯ আগস্ট ঘর থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি ষাটোর্ধ্ব এই নারী। কেটে গেছে প্রায় দেড় মাস। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে তার ছবি। থানায় করা হয়েছে সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। তবু মেলেনি কোনো সন্ধান।
শাশুড়িকে খুঁজে পেতে এবার চাকরি থেকেই এক মাসের ছুটি নিয়েছেন মেয়ের জামাই মোহাম্মদ সোহেল। এখন তার প্রতিদিনের ঠিকানা চট্টগ্রামের কোনো না কোনো এলাকা। সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন, দিনভর ছুটে বেড়ান এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। সন্ধ্যায় ফেরেন ক্লান্ত শরীরে। তবু থামছেন না ৪৪ বছর বয়সী এই যুবক। কারও কাছ থেকে সামান্য একটি খবর পেলেই দ্রুত যাচ্ছেন সেখানে।
আনোয়ারা বেগম চট্টগ্রাম নগরের উত্তর পাঁচলাইশের ভুলিয়া পাড়ার ওয়াহিদ আলী বাড়ির বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন তিনি। বয়সের ভারে স্মৃতিশক্তিও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুপুরের খাবারের পর নিয়ম করে হাঁটতে বের হতেন। সেই অভ্যাসের ধারাবাহিকতায় গত ৯ আগস্টও বের হয়েছিলেন। কিন্তু সেদিনের হাঁটা শেষ হয়নি ঘরে না ফেরায়।
আশপাশে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ১২ আগস্ট বায়েজিদ থানায় জিডি করেন মেয়ে ডলি আকতার। এরপর আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজনসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করা হলেও এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। আনোয়ারার একমাত্র সন্তান ডলি। তাই মেয়ের পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। ফলে সোহেলের কাছেও শাশুড়ি ছিলেন পরিবারেরই একজন সদস্য। চাকরির ফাঁকে
এতদিন শাশুড়িকে খুঁজেছেন সোহেল। কিন্তু তাতে যেন কোথাও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে এমনটা মনে হওয়ায় চলতি মাসের ১০ তারিখ একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব থেকে এক মাসের ছুটি নেন তিনি। এরপর থেকে তার একটাই শিডিউল-প্রতিদিন সকালে শাশুড়ির খোঁজে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়া।
সোহেল পূর্বকোণকে বলেন, ‘নগরের সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও শাশুড়িকে পাইনি। এখন চাকরি থেকে এক মাসের ছুটি নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরছি। কেউ একটু ইঙ্গিত দিলেই সেখানে ছুটে যাচ্ছি। গত ১৬ দিনে জেলার প্রায় সব উপজেলায় গিয়েছি। মাজার থেকে শুরু করে রেলস্টেশন-কোথাও খোঁজা বাদ দিইনি।’
গতকাল সন্ধ্যায় কথা বলার সময় সোহেল মাত্র রাউজান থেকে ফিরেছেন। তিনি বলেন, ‘একজন জানিয়েছিলেন রাউজানে আমার শাশুড়িকে দেখেছেন। খবর পাওয়ার পরই সেখানে ছুটে যাই। কিন্তু দিনভর ওই এলাকা ও আশপাশে খুঁজেও পাইনি।’আনোয়ারার সন্ধান পেলে সোহেলের মুঠোফোন নম্বরে (০১৮১২-০৪২৮১৫) যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
জিডিটি তদন্ত করছেন বায়েজিদ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ত্রিদীপ কুমার মন্ডল। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘ওই প্রবীণ নারীকে খুঁজে বের করতে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।’ মাকে হারিয়ে নাওয়া-খাওয়া প্রায় ভুলেছেন ডলি। প্রতিদিন সকালে স্বামী মোটরসাইকেল নিয়ে বের হওয়ার সময় তার চোখে থাকে একটাই প্রত্যাশা-আজ হয়তো মাকে নিয়ে ফিরবেন সোহেল। কিন্তু দিন শেষে সোহেল যখন বাড়ি ফেরেন, সঙ্গে থাকেন না সেই প্রতীক্ষিত মানুষটি।
পূর্বকোণ/নুসরাত

















