কর্ণফুলী নদীর তীরে পতেঙ্গায় একসময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল চিটাগাং স্টিল মিলস। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইস্পাত কারখানা। আকাশছোঁয়া চিমনি থেকে উদ্গত ধোঁয়া আর নিরন্তর উৎপাদনের গুঞ্জনে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। কিন্তু প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, বিশ্ববাজারে সঙ্গে ছন্দ মেলাতে না পেরে ঘটে ছন্দপতন। ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়।
স্টিল মিলের মৃত্যু : ১৯৬৭ সালে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যায় দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত কারখানা ‘চিটাগং স্টিল মিলস’। পতেঙ্গার শিল্পজীবনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ, বিশে^র সঙ্গে তাল মেটালে না পেরে গভীর সংকটে পড়ে। ধীরে ধীরে রুগ্ণ ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আর দাঁড়াতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে ১৯৯৮ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮০ কোটি টাকা পরিশোধ করে প্রতিষ্ঠানটিকে লে-অফ ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনে চিটাগং স্টিল মিলস লিমিটেড স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। ফলে বহু শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় হাজারো শ্রমিকের পদচারণায় মুখর স্টিল মিল।
ধ্বংসাবশেষ থেকে পুনর্জাগরণ : চিটাগং স্টিল মিলসের অধ্যায়ের অবসান হলেও সূচনা হয় আরেকটি নতুন অধ্যায়ের। শুরু হয় কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত এলাকার। ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় কর্ণফুলী ইপিজেডের। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বাণিজ্যমন্ত্রী (বর্তমান অর্থমন্ত্রী) আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর উদ্বোধন করেন। বেপজার অধীনে শুরু হয় নতুনভাবে শিল্পায়নের।
বিনিয়োগ : বেপজা সূত্র জানায়, ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে ১.৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে কর্ণফুলী ইপিজেড। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে ৭৮৭ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০ বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৪১২ গুণ।
এই ইপিজেডের ২৫৮টি শিল্পপ্লট (প্রতিটির আয়তন ২০০০ বর্গমিটার) রয়েছে। বর্তমানে ৪০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। যার মধ্যে ২৯টি শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তিনটি যৌথ মালিকানাধীন। আটটি দেশীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এছাড়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এই পাঁচটি শিল্পের জন্য ইতিমধ্যে বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে (ফ্লোর স্পেস ৪৯,৭৯৮ বর্গমিটার)।
বর্তমানে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে কর্ণফুলী ইপিজেডে। দেশগুলোর মধ্যে হলো-চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, জাপান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস্, মালয়েশিয়া প্রভৃতি।
রপ্তানি : ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে কর্ণফুলী ইপিজেড। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে রপ্তানি শুরু হয়। রপ্তানির প্রথম বছরে অর্থাৎ ২০০৭-৮ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৯ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুরু থেকে এ পর্যন্ত (চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত) রপ্তানি হয় ১৪ হাজার ১৫৬ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
৫ বছরের রপ্তানি : বিইপিজেটএ’র হিসাবে গত পাঁচ বছরে কর্ণফুলী ইপিজেডে রপ্তানি চিত্র নিচে উল্লেখ করা হল, ২১-২২ সালে ১৪৪৮ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন ডলার। ১৯২২-২৩ সালে ১৮৮৫ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলার। ২৩-২৪ সালে ১০১৮ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার। ২৪-২৫ সালে ১২৫৯ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। ২৫-২৬ সালে ১২৩০ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলার।
বহুমুখী শিল্পায়ন : কর্ণফুলী ইপিজেডের রপ্তানি কেবল গার্মেন্টস পণ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গার্মেন্টসের বাইরে এখান থেকে রপ্তানি হচ্ছে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী, বাইসাইকেল, চামড়াজাত পণ্য, ফার্নিচার, ব্যাগ, ফ্যাশন ও সেফটি স্যুর মতো পণ্য। বিশে^র নামকরা ব্র্যান্ডের পণ্য তৈরি করা হয় এখানে। রপ্তানি হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ছাড়াও ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশে^র অন্তত ৮০টি দেশে।
কর্ণফুলী ইপিজেডের ২০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক জানালেন, ‘এই বিশাল রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই এসেছে বিশ্বমানের প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন বা পণ্যের বৈচিত্র্য থেকে। কেইপিজেড এখন উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত হাবে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোর টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যার, ক্যাম্পিং টেন্ট ও হাই-টেক গিয়ার, বাইসাইকেল, সেফটি জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এখন তৈরি হচ্ছে।’
৮০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান : ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে কর্ণফুলী ইপিজেডের। স্টিল মিলের ধ্বংসাবশেষের জায়গাতেই বেপজার উদ্যোগে গড়ে ওঠে আধুনিক, পরিকল্পিত ও রপ্তানিমুখী এই শিল্পাঞ্চল। স্টিল মিলস লিমিটেডে ১০ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। বন্ধের সময় ছিল মাত্র ২ হাজার)। বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এরমধ্যে ৩৫৮ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। পরোক্ষভাবে ১ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কর্মশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশই নারী শ্রমিক।
পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্যানপার্ক বাংলাদেশের পরিচালক মো. খলিলুর রহমান মিল্টন বলেন, ‘এখানে প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক কাজ করেন।’
কারভো সাইকেলস লিমিটেডের প্রোডাক্টশন ম্যানেজার দেব কুমার দাশ (দেবু) বললেন, ‘প্রস্তুত করা সব সাইকেল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বছরে দুই লাখ পিস সাইকেল রপ্তানি করা হয়। কারখানায় ৪শ শ্রমিক কাজ করেন।
পূর্বকোণ/ইবনুর

















