চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল ও বাণিজ্যিক ভবনে পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ বন্ধ, পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ এবং নগরীর উপর চাপ কমাতে স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এর পাশাপাশি নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন, ২৫ বছরের জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরি এবং শহরের বাইরের পাঁচ উপজেলাকে সিডিএ’র আওতাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে আলাপকালে চট্টগ্রাম নগরী নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। দৈনিক পূর্বকোণের সঙ্গে আধঘণ্টাব্যাপী একান্ত সাক্ষাৎকারে সিডিএ চেয়ারম্যান টানা চলমান অভিযান, খসড়া মাস্টারপ্ল্যান তৈরি, নগরীর অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও এর চ্যালেঞ্জ এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে কর্মপরিকল্পনা বিশদভাবে তুলে ধরেন। তার সঙ্গে আলোচনার উল্লেখযোগ্য অংশপ্রশ্নোত্তর আকারে নিচে উপস্থাপন করা হল।
পূর্বকোণ: নগরীতে যানজটের অন্যতম কারণ কী মনে করেন?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: চট্টগ্রাম শহর বর্তমানে যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালের নিজস্ব পার্কিং না থাকা। এসব হাসপাতালকে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। পাশাপাশি কিছু হাসপাতাল নিরাপত্তাকর্মী বাড়িয়েছে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য নিজস্ব কর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।
পূর্বকোণ: নগরীর বেসরকারি স্কুল-কলেজের অনেকগুলোরই নিজস্ব পার্কিং নেই। এতে যানজট কতটা বাড়ছে?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: হ্যাঁ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে প্রবেশ ও ছুটির সময় বিপুলসংখ্যক ছোট যানবাহন রাস্তায় অবস্থান করে। এতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে জামালখান এলাকায় এ সমস্যা বেশি। এ ছাড়া নগরীর আরও কয়েকটি এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
পূর্বকোণ: এ যানজট নিরসনে সিডিএ কী উদ্যোগ নিচ্ছে?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: যানজট কমাতে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিকল্প চিন্তা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নগরীর বাইরে নতুন ক্যাম্পাস বা ফ্যাকাল্টি স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। বর্তমান ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালাতে হলে শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় পরিবহন, বিশেষ করে বাস ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ ছোট গাড়ির ব্যবহার কমানো গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক যানজট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
এরই অংশ হিসেবে জামালখানে অবস্থিত আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃপক্ষকে ভিন্ন সময়ে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু ও ছুটি দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির কার্যক্রম সকাল ৮টায় এবং সপ্তম শ্রেণির কার্যক্রম সকাল সাড়ে ৮টায় শুরু করা হলে ওই সড়কে গাড়ির চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
পূর্বকোণ: বাণিজ্যিক ভবনগুলোর পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: নগরীর প্রধান সড়কের পাশে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদেরও নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বড় বড় শপিংমল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও অনেকগুলোর নিজস্ব পার্কিং নেই। এখন থেকে পার্কিং ছাড়া প্রধান সড়কের ওপর কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথের অনুমোদন দেওয়া হবে না।
পূর্বকোণ: অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানোর কথা বলেছেন। এ বিষয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: সিডিএ থেকে অনুমোদিত ড্রইং-ডিজাইন অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করতে হবে। অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে ড্রেন, খাল বা ভবনের সামনে-পেছনে কোনো ধরনের ডেভিয়েশন করা হলে অভিযান চালিয়ে তা উচ্ছেদ করা হবে। ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ ডেভিয়েশন করা কয়েকটি ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলোতে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।
পূর্বকোণ: একদিকে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে অভিযান, অন্যদিকে নকশা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর কথাও বলছেন। বিষয়টি কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভালো কনসালটিং ফার্মের মাধ্যমে নকশা জমা দিলে স্বল্প সময়ের মধ্যে তা অনুমোদন করে সংশ্লিষ্টদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ভবনমালিকের কাছ থেকে একটি অঙ্গীকারনামা নেওয়া হবে। অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটলে বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব ও দুর্যোগ-সহনশীল ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী এবং সচিবের সমন্বয় সভার নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন ভবনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ভূগর্ভস্থ জলাধারে রাখার ব্যবস্থা এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পূর্বকোণ: ভবনের উচ্চতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: সড়কের প্রস্থ ও নগর পরিকল্পনা বিবেচনায় ভবনের উচ্চতা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ৬০ ফুট প্রশস্ত সড়কের ক্ষেত্রে বহুতল ভবনের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। কম জায়গায় উল্লম্বভাবে ভবন নির্মাণ করে বেশি মানুষকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
পূর্বকোণ: সিডিএর নতুন মাস্টার প্ল্যানে নগরের বাইরের পাঁচটি উপজেলাকে যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এটির উদ্দেশ্য কী?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের জন্য মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে। এতে আমাদের পার্শ্ববর্তী উপজেলা সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, রাউজান, পটিয়া ও আনোয়ারাকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এসব উপজেলাকে সম্পৃক্ত করে আমরা স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণ করতে চাই।
আনোয়ারায় ইতোমধ্যে চীনা বিনিয়োগকারীদের একটি হাব হচ্ছে। সেখানে কোরিয়ান ও মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারীরাও আসছেন। কর্ণফুলী উপজেলাকে নিয়েও আমাদের অনেক পরিকল্পনা আছে। সেখানে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য মার্কেট ও আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। কর্ণফুলী নদীর ওপারে একটি নান্দনিক পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে শহরের মানুষ বিকেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানে ঘুরতে যেতে পারেন।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেভাবে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, আমরাও সেভাবে করতে চাই।
হাটহাজারীতে স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণ করে মূল নগরীর ওপরের চাপ কমাতে চাই। আমরা মনে করি, এসব উপজেলা পরিকল্পিতভাবে সম্পৃক্ত হলে সেখানকার মানুষ শহরের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। একই সঙ্গে নগরীর ওপরের চাপও কমবে।
পূর্বকোণ: সম্প্রতি বিভিন্ন হাসপাতাল, বাণিজ্যিক ভবন ও স্কুলে পার্কিং ব্যবস্থা নিয়ে অভিযান পরিচালনা করছেন। এ কার্যক্রমে কোনো বাধার মুখে পড়ছেন কি?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: না। এটি তারেক রহমানের সরকার। এখানে যত বড় শক্তিশালী লোকই হোক না কেন আমরা কাউকেই ছাড় দেব না। স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক নেতাকর্মী, অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা; যারা সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মনে করছেন, তারা বিভিন্নভাবে তদবির করবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং নির্ভয়ে কাজ করতে বলেছেন। আমরাও কোনো আপস করব না।
পূর্বকোণ: নগরীর বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আপনি অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণকে কতটা দায়ী মনে করেন?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: একটি নান্দনিক শহরকে বিগত বছরের অপরাজনীতির কারণে কিছু ভূমিদস্যু ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত গিলে খেয়েছে। উন্নয়নের নামে এখানে তীব্র যানজটের সৃষ্টি করা হয়েছে। জলাবদ্ধতাও এই শহরে এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। চট্টগ্রামে ২৫-৩০ বছর আগে তো এভাবে জলাবদ্ধতা ছিল না।
চট্টগ্রাম ছিল নান্দনিক একটি শহর- সবুজ পাহাড়, কর্ণফুলী নদী, হালদা নদী ও বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে মনোমুগ্ধকর একটি নগর। কিন্তু আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম, বাণিজ্যিক এলাকায় মাল্টিপারপাস কার্যক্রম এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে তুলে শহরটাকে ধ্বংস করা হয়েছে। নালা, নর্দমা ও খালের ওপরও ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করা হয়নি। এর ফলে নান্দনিক শহরটি আজ জনগণের জন্য ভোগান্তির শহরে পরিণত হয়েছে।
পূর্বকোণ: আপনার চলমান অভিযান ও উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কী?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: চট্টগ্রাম শহর ৭০ লাখ মানুষের নগরী। নগরবাসী একটু স্বস্তিতে থাকতে চায়। একটি সবুজ চট্টগ্রাম গড়ে তোলা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যে স্বপ্ন, সেটি বাস্তবায়নের জন্যই আমাদের এই অভিযান।
এ অভিযান কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধেও নয়। যারা আবাসিক ভবন করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, যারা এই শহরে যানজটের সৃষ্টি করেছে, যারা এই শহরকে ক্ষতবিক্ষত করেছে- তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান।
পূর্বকোণ: নগরবাসীর প্রতি আপনার বার্তা কী?
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন: আমি আপনাদের মাধ্যমে নগরবাসীকে একটি বার্তা দিতে চাই- নগরীকে সুন্দর রাখা শুধু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নয়। আমরা সবাই এই নগরীর উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চাই। আমরা একটি পরিবর্তন চাই। এই পরিবর্তনের আওয়াজ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকেই শুরু করেছি। শহরের যানজট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত আমি থামব না।
পূর্বকোণ/রেহেনুমা

















