চট্টগ্রাম রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

বন্ধুর কবরের পাশে তপনের কান্না

বন্ধুর কবরের পাশে তপনের কান্না

তাসনীম হাসান

৩০ আগস্ট, ২০২৬ | ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ

সাদা কাফনে মোড়ানো বন্ধু মুজিবুর রহমানের নিথর দেহটা সারাজীবনের জন্য শুইয়ে দেওয়া হচ্ছে কবরে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটির দুনিয়ার সঙ্গে মিশে গেলেন তিনি। অদূরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলেন তপন শীল। চোখের সামনে প্রিয় বন্ধুকে চিরতরে হারিয়ে যেতে দেখে আর আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না এই প্রবীণ।

এতক্ষণ বুকের ভেতর আটকে রাখা শোক আর বাঁধ মানল না। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। আশপাশের মানুষ এগিয়ে এসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বন্ধুহারা মানুষটির কান্না থামছিলই না । কারণ, এই বিদায় যে চিরদিনের।

শুক্রবার দুপুরে এমন হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে হযরত খাজা গরীবুল্লাহ শাহ (র.)-এর মাজার ও কবরস্থান প্রাঙ্গণ। মুসলিম বন্ধু মুজিবুর রহমানের শেষ বিদায়ে হিন্দু বন্ধু তপন শীলের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা যেন আবারও মনে করিয়ে দিল-বন্ধুত্বের কোনো ধর্ম নেই, নেই কোনো বিভাজন।

তপন শীল ও মুজিবুর রহমানের বন্ধুত্বের শুরু ১৯৮০ সালে। নগরের কাজীর দেউড়িতে দক্ষিণ ফতেয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা তপনের একটি দোকান ছিল। সেখানে আসা-যাওয়া করতেন ব্যাটারি গলি এলাকার বাসিন্দা মুজিবুর। সেই আসা-যাওয়াতেই পরিচয়, তারপর বন্ধুত্ব। একে অপরের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা, একসঙ্গে প্রবাসজীবন-ধীরে ধীরে সেই বন্ধুত্ব ছড়িয়ে পড়ে দুই পরিবারেও। পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও গড়ে ওঠে গভীর সম্পর্ক। ৪৬ বছরের সেই বন্ধুত্বের ইতি টানল মৃত্যু।

বন্ধুর চলে যাওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি ৬৮ বছরের তপন। গতকাল রাতে ফোনে বন্ধুর কথা উঠতেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন তিনি। বললেন, ‘ও তো আমার শুধু বন্ধু ছিল না, আমার ভাই ছিল। আমি আমার ভাইকে হারিয়ে ফেললাম। এখন মন খারাপ হলে কার কাছে যাব, সুখ-দুঃখের কথা কাকে বলব?’

মুজিবুরকে নিয়ে কাটানো সময়গুলো যেন টুকরো টুকরো মেঘের মতো তপনের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। বলেন, ও ছিল খুবই উদার মনের মানুষ। একেবারে স্বচ্ছ। সেসব দেখেই বন্ধুত্ব শুরু। ও একটু মেজাজী মানুষ ছিল। সেজন্য আমি ও তার ভাই মিলে তাকে ১৯৮৯ সালের দিকে আরব আমিরাতে পাঠিয়ে দিই। সেখানে বেশ ভালো করে সে। এরপর তো ২০২০ সালে এসে আমাকে জোর করে তার কাছে নিয়ে যায়। এরপর ২০২০ সাল পর্যন্ত ওর সঙ্গেই সেখানে ছিলাম। করোনার সময়ে ওই বছরের ২০ অক্টোবর জীবনের বাকি সময়টা অবসরে কাটাতে একসঙ্গেই দুই বন্ধু দেশে চলে আসি।’

তপনের জীবনের কঠিন সময়েও ছায়ার মতো পাশে ছিলেন মুজিবুর। ১৯৯৭ সালে তপন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসক তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়ে দেন। পরিবারের অনেকেই অস্ত্রোপচারের ব্যাপারে দ্বিধায় ছিলেন। কারণ- তারা মনে করেছিলেন এতে মৃত্যুপথযাত্রী তপনের আরও কষ্ট বাড়বে। খবর পেয়ে বিদেশ থেকে দেশে ছুটে আসেন মুজিবুর। সবাইকে বুঝিয়ে বন্ধুর অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করেন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তপন।

বেশ কয়েকমাস ধরে অসুস্থ ছিলেন মুজিবুর। কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় প্রায় প্রতিদিনই তাঁকে দেখতে যেতেন তপন। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে প্রবর্তক এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান মুজিবুর। পরদিন জুমার নামাজের পর তাঁকে দাফন করা হয়। শেষ বিদায়ের পুরো সময়টিই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছিলেন তপন।

মুজিবুরের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তপনের ছবি ফেসবুকে দিয়েছেন অনেকেই। তাদেরই একজন মোহাম্মদ এমরান হোসাইন লেখেন, ‘ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তপন শীল। দীর্ঘদিনের বন্ধু মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি ছুটে যান তাঁর বাড়িতে। পাশে দাঁড়ান শোকসন্তপ্ত পরিবারের। এরপর জানাজা থেকে কবরস্থান- দাফন শেষ হওয়া পর্যন্ত ছিলেন বন্ধুর সঙ্গেই। এই বন্ধুত্ব বুঝিয়ে দিলো প্রকৃত বন্ধুত্ব কোনো ধর্মীয় সীমানা মানে না।’

পূর্বকোণ/রেহেনুমা 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট