চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

আনোয়ারায় বেড়িবাঁধ প্রকল্প : মাটি নিয়ে দ্বন্দ্ব, বাঁধের কাজ বন্ধ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

১৬ জুন, ২০২৬ | ৮:১০ পূর্বাহ্ণ

ইট, বালু, কংক্রিট ও মাটি সরবরাহের ভাগ-বাটোয়ারার দ্বন্দ্বের চাপে ‘অঘোষিত’ বন্ধ রয়েছে আনোয়ারা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ। ৩৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ দশমিক ১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্প পরিচালক বললেন, ‘বর্ষার কারণে কাজের গতি শ্লথ রয়েছে।’ তবে ঠিকাদার ও পাউবো জানায়, মাটি সরবরাহ নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক খ ম জুলফিকার তারেক পূর্বকোণকে বলেন, ‘বর্ষার কারণে উপকূলীয় এলাকায় কাজ করা কঠিন। বৃষ্টি ও সাগরের পানির স্রোতের কারণে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ঢালাইয়ের কাজ করা যায় না। তাই কিছু অংশের কাজ আপাতত শ্লথ গতিতে হচ্ছে। কাজ একেবারে বন্ধ হয়নি।’

 

২০২৪ সালের ২৭ মে আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলায় ভাঙন প্রতিরোধে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৮৭৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এরমধ্যে আনোয়ারার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৩৫১ কোটি টাকা।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, আনোয়ারার হাইলধর, জুঁইদণ্ডী, গহিরা ও পারকি ইউনিয়নে ৮ প্যাকেজে কাজ শুরু হয়নি। এরমধ্যে হাইলধর ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নে দুই দশমিক ৪০ কিলোমিটার এবং গহিরা থেকে পারকি পর্যন্ত অংশে দুই দশমিক ৭৮ কিলোমিটার টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

 

প্রকল্পের অর্ধেক কাজ অর্থাৎ চার প্যাকেজের কাজ চলছে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পিডিএল ও মেসার্স শেখ এমদাদ ওই অংশের কাজ বাস্তবায়ন করছে। আর বাকি চারটি অংশের কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড বাস্তবায়ন করছে। এরমধ্যে মেসার্স জামিল ইকবাল দুই প্যাকেজ এবং তাহের ব্রাদার্স ও শেখ ইকবাল একটি করে অংশের কাজ বাস্তবায়ন করছে।

 

পাউবো সূত্র জানায়, মেসার্স জামিল ইকবাল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটি অংশের কাজ বাস্তবায়ন করছে। এরমধ্যে একটি অংশের কাজ এখন পর্যন্ত ৬ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

 

পাউবো সূত্র জানায়, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে হওয়া চার প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি ৮০ শতাংশের বেশি। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে হওয়া অন্য চার প্যাকেজের কাজ ৬০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। আগামী বছরের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

 

গত ৪ মে উপকূলের দোভাষী বাজার এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ পরিদর্শনে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম। এ সময় তিনি বলেছিলেন, কাজের মান নিশ্চিত করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজে অনিয়ম হলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

উপ-ঠিকাদারি পেতে গোলাগুলি:

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। তবে প্রকল্পের কাজের ইট, বালু, কংক্রিট ও মাটি সরবরাহের জন্য স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে রায়পুর ইউনিয়নে প্রকল্পে আধিপত্য বিস্তার ও কাজ ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছিল। এই ঘটনায় পুলিশসহ দুই গ্রুপের ১৮ নেতাকর্মী আহত হয়েছিল।

 

মাটি সরবরাহ নিয়ে দ্বন্দ্ব:

এই ঘটনার পর বিপত্তিতে পড়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। শেষে স্থানীয় নেতাকর্মীদের দুই পক্ষ ইট, বালু, কংক্রিট ও মাটি সরবরাহ দিয়ে আসছিল। স্থানীয় একাধিক সূত্র ও গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, ফসলি জমি থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎস থেকে মাটি সরবরাহ করে আসছিল মাটি সরবরাহকারীরা। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাটি সরবরাহ করে আসছিল। মাটি কাটার কাজে অনেকটা নিশ্চুপ ছিল স্থানীয় প্রশাসন। বর্ষার পানিতে ফসলি জমি, পুকুর ও জলাশয়ে পানি জমার কারণে মাটির প্রধান উৎস ডুবে যায়। এরপর মাটিখেকোদের চোখ পড়ে বার আউলিয়া এলাকায় চর জেগে ওঠা ভূমিতে। সংরক্ষিত প্যারাবন সংলগ্ন এলাকা থেকে মাটি কাটা বন্ধ ও দুইপক্ষের দ্বন্দ্বের কারণে বাঁধ নির্মাণ বন্ধ রয়েছে

 

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানান, বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৫ লাখ ঘনফুটের বেশি মাটির ব্যবহার ধরা রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাধিক গ্রুপ উপ-ঠিকাদারির কাজ নিয়ে নানা উপকরণ সরবরাহ করছে। এখন মাটি সরবরাহ ও অন্য কাজে ভাগ-বাটোয়ারার বিরোধের কারণে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ অনেকটা বন্ধ রয়েছে।

 

পূর্বকোণ/আরআর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট