বহু আরাধ্যের একটি ভিডিও কল। সেটি ভর করে অন্য দেশ থেকে ভেসে আসা কিছু কণ্ঠস্বর আর ‘অচেনা’ প্রিয়জনদের মুখ। সেই কণ্ঠ আর মুখ দেখে শতবর্ষ ছুঁইছুঁই পরিমল বড়–য়ার চোখ ভিজে উঠল জলে। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যাদের চেহারা ছিল শুধু স্মৃতির ঝাপসা পাতায়, জীবনসায়াহ্নে এসে অবশেষে তাদের রক্তের উত্তরসূরিদের দেখতে পেলেন তিনি। শুধু স্বজনদের দেখা নয়, ভিডিও কলে মন ভরে দেখলেন ফেলে আসা নিজের গ্রামের দৃশ্যও। এত আনন্দের মাঝেও অবশ্য রয়ে গেল বিষাদ। যাদের খুঁজে পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা, তাদের অনেকেই যে আর পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় নেই।
পরিমল বড়ুয়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ধর্মপুর ইউনিয়নের আন্দারমানিক এলাকার সন্তান। কৈশোর থেকেই ছিলেন চঞ্চল। উড়ে বেড়ানো, ঘুরে বেড়ানো-এমন স্বাধীন জীবনই ছিল তার পছন্দ। তাই ঘরে আর মন টেকেনি। একদিন হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। তারপর আর কোনো খোঁজ মেলেনি। দিন গড়িয়ে বছর, বছর পেরিয়ে যুগ। এভাবে কেটে গেল অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়। পরিবার-স্বজনের কাছে পরিমল হয়ে গেলেন হারিয়ে যাওয়া এক নাম, এক স্মৃতি। হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা গেল, পরিমল বেঁচে আছেন। আছেন ভারতের ত্রিপুরায়। দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার লাওগাঁওয়ে নতুন করে গড়ে
নিয়েছেন জীবন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়ে সেখানেই কেটে যাচ্ছে তার শেষ সময়। কিন্তু বারবার মন পুড়ছিল ফেলে আসা স্বজনদের কথা ভেবে।
হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের খুঁজে দেওয়ার কাজ করা ফেসবুক পেজ ‘বঙ্গভিটা’-য় তার এক নাতির আবেদনসংবলিত একটি পোস্ট থেকেই জানা যায় পরিমলের জীবনের শেষ ইচ্ছার কথা। শৈশবের সেই গ্রামটিকে আরেকবার দেখতে চান তিনি। দেখতে চান নিজের মানুষদের। রক্তের সম্পর্কের কোনো স্বজনকে যদি খুঁজে পাওয়া যায়-জীবনের শেষ প্রান্তে সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় আকাক্সক্ষা।
আবেদনটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর ফটিকছড়ির কয়েকজন তরুণ এগিয়ে আসেন। শুরু হয় হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের খোঁজ। তাদের প্রচেষ্টাতেই শেষ পর্যন্ত পূরণ হয় পরিমলের দীর্ঘ অপেক্ষা।
কদিন আগে ভিডিওকলে পরিমল কথা বলেন স্বজনদের সঙ্গে। পর্দার ওপাশের মুখগুলো তার কাছে হয়তো অচেনা, কিন্তু কণ্ঠের ভেতর, কথার ভাঁজে, স্মৃতির গভীরে তিনি যেন খুঁজে পেলেন বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আপনজনদের। আর নিজের গ্রামের দৃশ্য যখন চোখের সামনে ভেসে উঠল, তখন আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পরিমল বড়ুয়া। চোখ বেয়ে নেমে এলো জল।
বঙ্গভিটা’য় পোস্টটি করেছিলেন পরিমল বড়–য়ার নাতি আনন্দ বড়–য়া। এই তরুণের সঙ্গে কথা হয় পূর্বকোণের। তিনি বলেন, ‘দাদু এখন জীবনসায়াহ্নে। ব্রেন স্ট্রোক করার পর থেকে খুব অসুস্থও। বয়স আর অসুস্থতার ভারে স্মৃতিশক্তি অনেকটা দুর্বল হলেও আপনজনদের স্মৃতি আজও তার হৃদয়ে অমলিন। সবসময় আমাদের বলতেন, তার স্বজনদের খোঁজ করে দিতে। সেই স্বজনদের খুঁজে বের করতে আমরা বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট তৈরি করছিলাম। এরই মধ্যে বঙ্গভিটা পেজের সন্ধান পেয়ে সেখানে পোস্ট করি। একদিনের মাথাতেই পেয়ে যাই। প্রতিদিন দাদুর এখন কথা হয় স্বজনদের সঙ্গে। এরপরও দাদুর বাড়ি দেখতে বাংলাদেশ যাব শিগগির।’
পরিমল বড়ুয়ার স্বজনদের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে দেওয়ার কাজটি করেছেন সাংবাদিক সোলাইমান আকাশ। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘ত্রিপুরার বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। বঙ্গভিটা’য় ওই পোস্টটি হওয়ার পর তাদের অনেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চান। পোস্টটিতে দেওয়া ঠিকানা অস্পষ্ট থাকায় শুরুতে স্বজনদের বের করা কঠিন হয়ে যায়। তবে পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের পাই এবং কথা বলিয়ে দিই। একজন মানুষের জীবনের শেষ ইচ্ছে পূরণ করে দিতে পেরে ভালো লাগছে।’
পরিমল বড়ুয়ার খোঁজ পেয়ে খুশি তার বাংলাদেশি স্বজনেরাও। তার চাচাতো ভাইয়ের সন্তানের মেয়ে পান্তা বড়ুয়া পূর্বকোণকে বলেন, ‘বাবাদের কাছে শুনেছিলাম, আমাদের একজন দাদু বহু বছর আগে হারিয়ে গিয়েছেন। তিনি যে বেঁচে আছেন, সেটিও জানতাম না। এত বছর পর যে সেই দাদুর খোঁজ পাব ভাবিনি। খুব ভালো লাগছে।’
৫০ বছরেরও বেশি সময় পর নিজের মাটি আর স্বজনদের ফিরে দেখা-জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পরিমল বড়ুয়ার কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো আর কিছু ছিল না। তবে ফিরে পাওয়ার এই আনন্দের পাশেই রয়ে গেল একরাশ দীর্ঘশ্বাস। যাদের জন্য এত বছর অপেক্ষা, তাদের অনেকের সঙ্গেই দেখা হবে না আর কোনোদিন।
পূর্বকোণ/মিফতা

















