চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই বাড়তি ভাড়া আদায়, যাত্রী হয়রানি

জ্বালানির দাম বৃদ্ধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ২:১২ অপরাহ্ণ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলেও সরকার এখনও গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির কোনো ঘোষণা দেয়নি। অথচ এরই মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন রুটে লোকাল বাস ও টেম্পোর চালকেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে তা আদায় করছেন। কোথাও কোথাও নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মর্জিমাফিক বাড়তি ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে গতকাল সোমবার নগরের বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের সঙ্গে বাসচালক ও কন্ডাক্টরদের কথা-কাটাকাটি হয়েছে। কোথাও কোথাও তা হাতাহাতিতেও গড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সুযোগে বাড়তি ভাড়া আদায়ে নেমেছে গ্যাসচালিত যানবাহনও। সরকারি ঘোষণা ছাড়াই পরিবহন শ্রমিকদের এভাবে ভাড়া বাড়িয়ে আদায় করায় একদিকে যাত্রীদের ভোগান্তি ও ক্ষোভ বাড়ছে, অন্যদিকে নগরের গণপরিবহন ব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে এক ধরনের নৈরাজ্য।
যাত্রীদের অভিযোগ, ভাড়া বাড়ানোর অপকৌশল হিসেবে রাস্তায় গতকাল গণপরিবহনের সংখ্যা অনেক কম ছিল। অনেকেই বাড়ি ফিরতে গাড়ি না পেয়ে ট্যাক্সি ও রিকশায় উঠতে বাধ্য হয়েছেন।
গতকাল খবর নিয়ে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, জিইসি, ওয়াসা, আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, চকবাজার, নিউমার্কেট ও অলংকার মোড় এলাকায় বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নগরের ১০ নম্বর রুটের দুই নম্বর গেট থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত আগে ১৫ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও কোনো কোনো বাসে এখন ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। মুরাদপুর-আন্দরকিল্লা রুটেও ১৫ টাকার পরিবর্তে ১৮ থেকে ২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত ৬৮ টাকার ভাড়াও কোনো কোনো বাসে ৮০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
নগর থেকে শহরতলীর বাসগুলোও একইভাবে ৫ টাকা থেকে ১০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছেন বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন। তবে জাহাঙ্গীর আলম নামের একজন বাস চালক বলেন, ‘তেলের দাম বেড়েছে। গাড়ির যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে। বাধ্য হয়ে আমরা বাড়তি নিচ্ছি।’ কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা না দেওয়া সত্তে¡ও বাড়তি ভাড়া আদায়ের কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ টেম্পো চালকদের বিরুদ্ধে। গতকাল সকাল থেকেই বিভিন্ন রুটের টেম্পোচালকেরা নিজেদের খেয়াল খুশিমতো বাড়তি ভাড়া আদায় করে ছেড়েছেন। তারা দূরত্বভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নিয়েছেন।
শাহ আমানত সড়ক-ওয়াসা রুটে চলা টেম্পোর নিয়মিত যাত্রী সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘বহদ্দারহাট থেকে জিইসি পর্যন্ত নির্ধারিত ভাড়া ১৫ টাকা। কিন্তু তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে ১৮ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে টেম্পো না চালানোর হুমকি দিচ্ছেন চালকেরা।’
বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এরকম অভিযোগ আমরাও পেয়েছি। চালকদের নিষেধও করেছি। তিনি বলেন, আমরা সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। দুয়েকদিনের মধ্যে সরকার ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করে দিলে বিআরটিএ তা ঘোষণা করবে। সেই অনুযায়ী ভাড়া আদায়ের জন্য আমরা মালিক- চালকদের জানিয়ে দিব। এর আগে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় কিংবা বাড়তি ভাড়া না দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আগামী শনিবার থেকে যৌক্তিক হারে ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি মেট্রো প্রভাতীর চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বেলালও।
তিনি বলেন, ‘আমাদের যেহেতু বিশেষায়িত পরিবহন তাই চাইলেই আমরা ভাড়া বাড়িয়ে দিতে পারি না। শুনেছি ২/১ দিনের মধ্যে ভাড়া বাড়ানো সংক্রান্তে সরকারের সিদ্ধান্ত আসবে। আমরা অবশ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী শনিবার থেকে যৌক্তিক হারে ভাড়া বৃদ্ধি ও আদায় করবো। এ সংক্রান্তে একটি নোটিশ আজ মঙ্গলবার মেট্রো প্রভাতীর বিভিন্ন কাউন্টারে লাগিয়ে দেব। যাতে যাত্রী সাধারণ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন।’
সরকারিভাবে ঘোষণা দেয়ার আগ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায়ের কোন অধিকার কারো নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মুসা। তিনি বলেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্ত হলে বিআরটিএ ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পরই সেই মোতাবেক ভাড়া গ্রহণ করা যাবে।’ এর আগে কোন বাস চালক-কন্ডাক্টর বেশি ভাড়া নিলে তা না দেওয়া এবং যাত্রীদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
চট্টগ্রাম অটোরিকশা অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশিদ বিভিন্ন রুটে টেম্পো চালকদের অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তবে তিনি বলেন, ‘সবাই না, কোন কোন টেম্পো চালক মর্জিমাফিক ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন, এরকম অভিযোগ পেয়েছি। চালকদের বলছি, আপনারা সরকারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সরকার বর্ধিত ভাড়া নির্ধারণ করে দিলে তারপর সেই মোতাবেক আদায় করুন।’
প্রসঙ্গক্রমে চট্টগ্রাম অটোরিকশা অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘নির্ধারিত দৈনিক জমার টাকার চেয়ে টেম্পো মালিকেরা ৩/৪ শ টাকা অতিরিক্ত আদায় করেন। চালকেরা তাই বাধ্য হয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে নিজেদের ইচ্ছেমাফিক ভাড়া আদায় করছেন। যদিও এটাকে আমরা সমর্থন করি না।’

পূর্বকোণ/পল্লবী

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট