চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসের ২০ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে আগস্টের পুরো মাসের হিসাব। একই সঙ্গে চলতি বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটেছে সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনে। আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হারও এ মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৪৬৩ জন। এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪২৭ জন। অথচ আগস্টের পুরো ৩১ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২০২ জন। অর্থাৎ আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই ২২৫ জন বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।
এদিকে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে জেলায় মারা গেছেন ১৭ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের, যা একইসময়ে মোট মৃত্যুর ৭০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আগস্টে ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন দুইজন। সে হিসাবে আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মাত্র ২০ দিনেই মৃত্যু বেড়েছে ছয় গুণ।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় রোগী ক্রিটিক্যাল ফেজে প্রবেশ করতে পারেন। দেরিতে হাসপাতালে আসা, প্লাজমা লিকেজ, শক ও রক্তক্ষরণের মতো জটিলতা দেখা দিলে দ্রæত পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, এ বছর এমন অনেক রোগী হাসপাতালে আসছেন, যাদের রক্তচাপ মাপাও কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেকের পেটে ও ফুসফুসে পানি জমছে এবং কারও কারও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তবে আগস্টে তুলনামূলক কম রোগী পাওয়া গেলেও সেপ্টেম্বরে এসে রোগী বেড়েছে। হাসপাতালগুলোতেও শয্যায় জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। এরবাইরে চিকিৎসকদের চেম্বারেও আসছেন অনেকেই। ধারণা করা হচ্ছে- ডেঙ্গুর সেরোটাইপে (ধরণ) পরিবর্তন ঘটেছে।
এদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় বলেন, অনেকে জ্বর কমে গেলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে মনে করেন। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সংকটাপন্ন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ সময় প্লাজমা লিকেজ হয়ে রোগী দ্রæত শকে চলে যেতে পারেন।
সেপ্টেম্বরেই বাড়ে ডেঙ্গুর প্রবণতা: চট্টগ্রামে গত পাঁচ বছরের সেপ্টেম্বরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিবছর এই মাসেই ডেঙ্গুর প্রবণতা বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৬০১ জন, ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৮৯২, ২০২৪ সালে ৯০৭ এবং ২০২৫ সালে ৯৩৫ জন।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪২৭ জন। অর্থাৎ মাস শেষ হওয়ার আগেই ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পুরো সেপ্টেম্বরের আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।
মৃত্যুর দিক থেকেও চলতি সেপ্টেম্বরের চিত্র পাঁচ বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনজন, ২০২৩ সালে ২১, ২০২৪ সালে ১১ এবং ২০২৫ সালে চারজন ডেঙ্গুতে মারা যান। চলতি সেপ্টেম্বরের ২০ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের।
এদিকে, মাসভিত্তিক আক্রান্তের হিসাবেও জুনের পর থেকে দ্রুত ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। জানুয়ারিতে ৬৮, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭, জুনে ১২২, জুলাইয়ে ৫৩৬, আগস্টে ১ হাজার ২০২ এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনে ১ হাজার ৪২৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
শহরের সঙ্গে সমানতালে গ্রামেও সংক্রমণ: ডেঙ্গুর বিস্তার এখন শুধু চট্টগ্রাম নগরকেন্দ্রিক নয়। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মোট ৩ হাজার ৪৬৩ আক্রান্তের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের বাসিন্দা ১ হাজার ৫২৪ জন। আর ১৫টি উপজেলার বাসিন্দা আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৫৩১ জন। মহানগরের বাইরে অন্যান্য জেলা থেকে চট্টগ্রামে এসে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা ৪০৮ জন। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের ৪৪ দশমিক ০১ শতাংশ মহানগর এবং ৪৪ দশমিক ২১ শতাংশ উপজেলা থেকে এসেছে। মহানগরের তুলনায় উপজেলা থেকে আক্রান্তের সংখ্যা সাতজন বেশি।
মৃত্যুর ক্ষেত্রেও উপজেলায় আক্রান্তদের মধ্যে প্রাণহানির সংখ্যা বেশি। চলতি বছরের ১৭ মৃত্যুর মধ্যে মহানগরের সাতজন, উপজেলার নয়জন এবং অন্যান্য জেলার একজন রয়েছেন। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৫২ দশমিক ৯৪ শতাংশই উপজেলার বাসিন্দা।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সীতাকুণ্ডে। চলতি বছর এ উপজেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬০ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ২২০, বাঁশখালীতে ১১৪, রাঙ্গুনিয়ায় ১১৩ এবং আনোয়ারায় ৮১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলাতেই আক্রান্ত হয়েছেন ৬৮০ জন, যা উপজেলার মোট আক্রান্তের ৪৪ দশমিক ৪২ শতাংশ।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২১৬ জন: সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২১৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতালভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৫২০ জন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন পাঁচজন। বিআইটিআইডিতে ৪৬৫ জনের চিকিৎসা হয়েছে এবং সেখানে কোনো মৃত্যু নেই। ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৪৩ জন, মারা গেছেন একজন। চট্টগ্রাম সিএমএইচে ১৩৬ জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ৩৬৬ জন চিকিৎসা নিয়েছেন; এসব প্রতিষ্ঠানে কোনো মৃত্যুর তথ্য নেই। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৩২ জন। এসব প্রতিষ্ঠানে মারা গেছেন ১১ জন।
তথ্য অনুযায়ী, মোট রোগীর তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর অংশ ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ হলেও মোট মৃত্যুর ৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ সেখানে ঘটেছে।
পূর্বকোণ/ইবনুর

















