চট্টগ্রাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর একটি জাকির হোসেন রোড। জিইসির জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের গেট থেকে ঝাউতলা রেল ক্রসিং পর্যন্ত বিস্তৃত এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির পরিচ্ছন্নতা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নিয়মিত কার্যক্রমের কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ উল্টো।
সড়ক ও ফুটপাত পরিষ্কারের কথা প্রতিদিন। চসিকের দাবি, প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত নগরের ওয়ার্ডগুলোতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ কাজে রয়েছে প্রায় ৮০০ পরিচ্ছন্নতাকর্মী। কিন্তু জাকির হোসেন রোডে নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে সড়ক ও ফুটপাতে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় একদিন নয়, দুই থেকে তিন দিন পর পর পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের দেখা মেলে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে— প্রতিদিন পরিষ্কারের জন্য জনবল থাকলে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি প্রতিদিন নোংরা থাকে কীভাবে? আর রাতভর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চললে সকালে ফুটপাত ও সড়কের পাশে ময়লা পড়ে থাকে কেন?
স্থানীয়দের অভিযোগ, সমস্যাটি শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজে অনিয়মের নয়; এর পেছনে রয়েছে কার্যকর তদারকির ঘাটতি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি করলে নির্ধারিত সময়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম হচ্ছে কি না, কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন কি না এবং পরিষ্কার করার পর কোথাও নতুন করে ময়লা জমছে কি না— তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব।
প্রতিদিন পরিষ্কারের কথা, বাস্তবে দুই-তিন দিনেও একবার
ওয়ারলেস এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. বোরহান উদ্দীন বলেন, নগরীর প্রধান সড়কগুলো সকালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার কথা। কিন্তু জাকির হোসেন রোডের বিভিন্ন অংশে প্রায় প্রতিদিনই ফুটপাত ও সড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়।
তিনি বলেন, ‘রাতে নিয়মিত পরিষ্কার করা হলে সকালে এভাবে ময়লা পড়ে থাকার কথা নয়। যারা তদারকির দায়িত্বে আছেন তারা নিয়মিত মাঠে গিয়ে দেখলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হওয়ার কথা নয়।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো কোনো দিন সড়কের একটি অংশ পরিষ্কার করা হলেও অন্য অংশে ময়লা পড়ে থাকে। আবার কোথাও ঝাড়ু দেওয়া হলেও আবর্জনা যথাযথভাবে অপসারণ করা হয় না। ফলে কিছুক্ষণ পর সড়ক ও ফুটপাতের পাশে আবারও ময়লা জমে যায়।
৮০০ সেবক, তবু কেন এই দশা?
চসিকের এক পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নগরীর সড়ক ও ফুটপাত পরিষ্কার রাখতে প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাজ করেন। এ কাজে প্রায় ৮০০ সেবক নিয়োজিত রয়েছেন।
তবে একই কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, সুযোগ পেলে অনেকেই কাজে ফাঁকি দেন। আর এ কারণেই অনেক সময় সড়ক ও ফুটপাতে আবর্জনা পড়ে থাকে।
তবে এই বক্তব্যেই উঠে আসে মূল প্রশ্ন— কাজে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয় কীভাবে?
পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নির্ধারিত সময়ে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা দেখার জন্য মাঠপর্যায়ে তদারকি ব্যবস্থা থাকার কথা। কোনো কর্মী দায়িত্বে অনুপস্থিত থাকলে বা নির্ধারিত এলাকা পরিষ্কার না করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই তদারকি কতটা কার্যকর, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী।
নোংরা সড়ক, ভোগান্তিতে পথচারী
জাকির হোসেন রোডে ময়লা পড়ে থাকার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী পথচারীরা। ফুটপাতের ওপর আবর্জনা পড়ে থাকায় অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ থাকে না। বাধ্য হয়ে পথচারীদের সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করতে হয়।
ব্যস্ত এই সড়কে যানবাহনের চাপের মধ্যে পথচারীদের সড়কে নেমে চলাচল করতে হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। পাশাপাশি পচনশীল আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে পথচারী ও আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লোকজনকেও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
নগরবাসীর প্রশ্ন, যে সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন, সেই সড়কটির পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাই যদি সম্ভব না হয়, তাহলে নগরজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কেন?
দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কারণ একজন কর্মী দায়িত্বে ফাঁকি দিলে তার কাজ তদারক করার জন্যই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের সুপারভাইজার থাকার কথা।
তাই কোনো এলাকায় নিয়মিত ময়লা পড়ে থাকলে প্রশ্ন উঠবে তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও।
স্থানীয়দের মতে, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে শুধু ‘কতজন কর্মী আছে’—এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং কে কোন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন, কখন কাজ করছেন, কাজটি ঠিকমতো হয়েছে কি না এবং কাজ না হলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসবের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই জরুরি।
নগরবাসীর প্রত্যাশা
শুধু জাকির হোসেন রোডের জন্য নয়, পুরো নগরের পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গেই জড়িত।
চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন নগর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শুধু পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো কিংবা রাতভর কার্যক্রমের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, কাজের বাস্তব মূল্যায়ন এবং দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে জবাবদিহি।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, চসিক বিষয়টিকে একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগ হিসেবে না দেখে জাকির হোসেন রোডের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করবে এবং প্রতিদিনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।
কারণ নগরবাসীর কাছে শেষ পর্যন্ত হিসাবটা খুব সরল— কাগজে-কলমে কতজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করেন, তা নয়; সকালে রাস্তা ও ফুটপাত কতটা পরিষ্কার থাকে, সেটিই আসল।


















