সোমা (ছদ্মনাম) প্রাইভেট ফার্মের চাকরি করে। নগরীতে ভাড়া বাসায় থাকে। স্বামী মারা গেছে বেশ কয়েক বছর হলো। একটা মেয়ে, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। পড়ালেখার পাশাপাশি মেয়েও টিউশন করে। এ নিয়ে তাদের সংসার চলে যাচ্ছিলো। হঠাৎ বাড়ির মালিক বলল বাসাটা তাদের লাগবে, অন্য জায়গায় বাসা দেখতে। আর যদি ওই বাসায় থাকতে হয় তাহলে বেশ ভালো একটা এডভান্স ও ৪০ শতাংশ বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হবে।
এক কথায় ওই বাসা ছাড়ার জন্যই এ পরিকল্পনা। এবার বাসা বদলানোর তাড়া। নগরের জামালখান, আন্দরকিল্লা, রহমতগঞ্জ, দিদার মার্কেট, দেওয়ান বাজার, চন্দনপুরা, বাকলিয়া, হেমসেন লেইন, নন্দনকানন, পাথরঘাটা, রুমঘাটা, মাচুয়াঝর্না, ঘাটফরহাদবেগ সব জায়গায় খুঁজেও তাদের সামর্থ্যের মধ্যে একটা বাসা ভাড়া নিতে পারলেন না। একপ্রকার নিরুপায় হয়ে হেমসেন লেইনে ১৫ হাজার দিয়ে ৫ তলায় দুই বেড রুমের বাসা ভাড়া নিতে হল। যে দুই বেডরুমের বাসা এক দশক আগেও ১০-১২ হাজার টাকায় পাওয়া যেতো তা এখন এলাকাভেদে ১৫-২০ হাজার টাকায় নিতে হচ্ছে। তার ওপর আছে অগ্রিম ভাড়া দেওয়ার ঝামেলা।
এটা শুধু সোমার গল্প নয়, এটাই এখন মধ্যবিত্তের জন্য চরম বাস্তবতা! যেখানে শুধু বাসাভাড়া দিতেই বেতনের প্রায় টাকা চলে যায়। ঢাকা শহরের মতো চট্টগ্রামেও প্রায় ৭০ লাখ (চসিকের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী) মানুষের বসবাস। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ভাড়াবাড়িতে বসবাস করে। ফলে নগরের আবাসন চাহিদা ও ভাড়ার বাজার দুটিই দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বন্দরনগরীর অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় অংশই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির।
আর এই শ্রেণির সবচেয়ে আতঙ্কের নাম বাসা ভাড়া। যা প্রতি মাসের ১-১০ তারিখে গুনতে হয়। তার ওপর ছেলে-মেয়ের স্কুল-কলেজ, যাতায়াত, অসুস্থতা, ইউটিলিটি চার্জ, চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের বাজারে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত এই বাসা ভাড়া। গত এক দশকে এই বাসা ভাড়া এলাকা ভেদে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ইয়াসিন। বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি বললেন, ‘মাসের ২০ তারিখ আসতেই বেতন শেষ হয়। তারপর লোন করতে হয়। যে বাসায় ভাড়া থাকি তাতে কদিন পর পর নানা সমস্যা দেখা দেয়, কখনও বেলকনির থাই গ্লাসে সমস্যা, কখনো পানির কল জ্যাম আবার কখনও কারেন্টের লাইনে সমস্যা। এই সব সমস্যাগুলোও আবার নিজেদের ঠিক করতে হয়। বাড়ির মালিকের সাফ কথা এসব চালাতে পারলে থাকেন, না হয় অন্য জায়গায় বাসা দেখেন।’
নাম প্রকাশ না করা শর্তে বাকলিয়ার এক বাড়িওয়ালা বললেন, ‘গত কয়েক বছরের নির্মাণ ব্যয়, জমির মূল্য, ভবন রক্ষণাবেক্ষণ, লিফট, জেনারেটর, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতা, পানি সরবরাহ ও কর সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে। তাহলে বাসা ভাড়া না বাড়িয়ে উপায় কী?’ খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ ‘১৯৯১ সালের আইন’ বাড়ির মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা ও ভাড়াটিয়াদের শোষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য দেশে ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ রয়েছে। তবে আইনটি কেবল বইয়ের পাতাতেই বন্দী, বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ চট্টগ্রাম শহরে নেই বললেই চলে।
আইনটিতে বলা হয়েছে কোনো বাড়ির ভাড়া মানসম্মত ভাড়ার বেশি বাড়ানো যাবে না। সাধারণত কোনো ভবনের নির্মাণ খরচ এবং তৎকালীন বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতি বছর সর্বোচ্চ এক-পঞ্চমাংশ (২০%) পর্যন্ত বার্ষিক মূল্য ধরে মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করার কথা। কিন্তু নগরীতে কোনো নিয়ম ছাড়াই প্রতি বছর বা দুই বছর পরপর মালিকরা ইচ্ছেমতো ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়ে দেন। বাড়ির মালিক এক মাসের ভাড়ার বেশি অগ্রিম বা জামানত হিসেবে দাবি করতে পারবেন না। অথচ চট্টগ্রামে দুই থেকে চার মাসের ভাড়া অগ্রিম হিসেবে দেওয়া প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাড়া আদায়ের পর বাড়ির মালিক লিখিত রশিদ দিতে বাধ্য। কিন্তু নগরীর ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো রশিদ দেওয়া হয় না। ফলে ভবিষ্যতে ভাড়া সংক্রান্ত কোনো আইনি বিরোধে ভাড়াটিয়ারা নিজেদের পক্ষে লিখিত প্রমাণ জমা দিতে পারেন না। উপযুক্ত কারণ এবং আইনি নোটিশ ছাড়া হঠাৎ করে কোনো ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না। বাস্তবে দেখা যায়, ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে রাজি না হলেই বাড়ির মালিকরা এক মাসের নোটিশে বা অমানবিক আচরণ করে ভাড়াটিয়াদের বাসা ছাড়তে বাধ্য করেন। আবার সব ভাড়াটিয়া কিন্তু এক নয়। আইন অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশন বা সরকার কর্তৃক এলাকাভিত্তিক ‘রেন্ট কন্ট্রোলার’ বা ভাড়া নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা থাকার কথা। যিনি ভাড়া সংক্রান্ত বিবাদ বা অভিযোগের নিষ্পত্তি করবেন। চট্টগ্রাম নগরীতে এই ব্যবস্থার নামগন্ধও নেই।
লাগাম টানতে যা করা জরুরি
নগরবিদদের মতে, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে অবিলম্বে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে উদ্যোগ নিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডের ভৌগোলিক অবস্থান, নাগরিক সুবিধা এবং ভবনের গুণগত মান বিবেচনা করে সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন ‘মানসম্মত ভাড়া’ নির্ধারণ করে দিতে হবে। ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ শোনা মাত্র ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চসিক বা জেলা প্রশাসনের অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট ‘রেন্ট কন্ট্রোলার সেল’ বা মোবাইল কোর্টের ব্যবস্থা করা। মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে অন্তত ১ বছরের লিখিত চুক্তি এবং রশিদের মাধ্যমে লেনদেন বাধ্যতামূলক করা।
নগরীর প্রতিটি ভবনের হোল্ডিং নম্বরের সাথে ভাড়ার হার যুক্ত করে ডিজিটাল ডাটাবেস তৈরি করা, যাতে কোনো মালিক রাতারাতি ভাড়া বাড়াতে না পারেন। চট্টগ্রামে বাসাভাড়ার সমস্যা এখন আর ব্যক্তিগত ভোগান্তির বিষয় নয়; এটি নগর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, পরিবার, জনস্বাস্থ্য ও নগর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় সামাজিক সমস্যা। ভাড়া বাড়লে শুধু একজন ভাড়াটিয়ার মাসিক বাজেটই বদলায় না তার সন্তানের শিক্ষা, সঞ্চয়, চিকিৎসা, জীবনযাত্রা এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের সিদ্ধান্তও বদলে যায়। নগর কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে এই ‘লাগামহীন ঘোড়ার’ মুখে লাগাম পরানো, যাতে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো অন্তত একটুকরো ছাদের নিচে শান্তিতে শ্বাস নিতে পারে।
পূর্বকোণ/নুসরাত


















