চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট : ভারী শিল্পে উৎপাদনে বড় বিপর্যয়

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট : ভারী শিল্পে উৎপাদনে বড় বিপর্যয়

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২:০২ অপরাহ্ণ

এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ভারী শিল্পের উৎপাদনে বড় ধস নেমেছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় রড ও সিমেন্ট উৎপাদনকারী ভারী শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দিনে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এরফলে রড ও সিমেন্ট উৎপাদন অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন টিকিয়ে রাখা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্পমালিকেরা।

 

শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, গত দুই বছর ধরে রড, সিমেন্টসহ নির্মাণ খাতের ব্যবসায় মন্দাভাব চলছে। তার উপর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ধস নেমেছে। কিছু কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এরফলে কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

 

ইস্পাত খাতের কোম্পানি বিএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ আগের তুলনায় একটু বেড়েছে। এখন ৭০-৭৫ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। এর আগে গ্যাস সংকটে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল।’

 

উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে লোকসান গুনতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামীতে ভালো হবে-এই আশায় এখন লোকসান দিয়ে কারখানা চালু রাখতে হচ্ছে। তবে আগামীতে গ্যাসের পরিস্থিতি ভালো না হলে শিল্পকারখানার জন্য আরও বুমেরাং হতে পারে।’

 

গোল্ডেন ইস্পাতের পরিচালক মোহাম্মদ সরওয়ার আলম পূর্বকোণকে বলেন, ‘রড উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে স্বাভাবিক চাহিদার বিপরীতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে।’

 

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে উৎপাদন কার্যক্রম প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত সীমিত বা বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলে জানান চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ মোস্তফা হাকিম গ্রুপ-এর পরিচালক সরওয়ার আলম। তিনি বলেন, সংকটের কারণে উৎপাদন ঘাটতি, কারখানার পরিচালন ব্যয়, শ্রমিক-কর্মীদের ব্যয় এবং উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় কারখানা চালুর অতিরিক্ত ব্যয়সহ বিভিন্নভাবে আমাদের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

 

শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রড, সিমেন্টসহ ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। ইস্পাত কারখানার চুল্লি ও মেশিন গ্যাসের উচ্চ চাপে পরিচালনা করতে হয়। বারবার উৎপাদন বন্ধ ও চালু করতে উৎপাদন ব্যাঘাত-যন্ত্রপাতির কার্যকারিতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। সামগ্রিকভাবে তা উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

 

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) হিসাবে, দেশে ইস্পাত খাতে স্বয়ংক্রিয় কারখানা প্রায় ৪০টি। কারখানাগুলোয় বছরে এক কোটি টনের বেশি রড উৎপাদনের সক্ষমতা আছে।

 

কেএসআরএমের পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. জসিম উদ্দিন পূর্বকোণকে বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে উৎপাদন নেই বললেই চলে। আগে আমরা দিনে ১৮-২০ ঘণ্টা কারখানা চালু রাখতাম। উৎপাদন করতাম। সেখানে এখন ২-৩ ঘণ্টার বেশি উৎপাদনে যেতে পারছি না। অল্প যে পরিমাণ প্রেসার (গ্যাসের চাপ) থাকে তা দিয়ে উৎপাদনে যাওয়া যায় না। সবমিলে বড় সংকট যাচ্ছে।’

 

সংকটের কারণে রডের দামও বেড়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংকটের কারণে উৎপাদন কমে গেছে। বাজারে সংকটের কারণে টনপ্রতি ১০০০ টাকা দাম বেড়ে গেছে।’

 

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ মিলছে প্রায় আড়াই শ মিলিয়ন ঘনফুট। মধ্য আগস্টে গ্যাস সংকটের সময় ১৭০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছিল।

 

সিমেন্ট শিল্প: বর্তমানে দেশে সিমেন্ট উৎপাদনে রয়েছে ৩৫ থেকে ৪০টি কোম্পানি। বছরে সিমেন্টের চাহিদা রয়েছে চার কোটি টনের। তবে উৎপাদনে থাকা সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে আট কোটি টনের।

 

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কেএসআরএম গ্রুপের সিমেন্ট উৎপাদন ৩০-৩৫ শতাংশ কমে গেছে বলে জানান জনসংযোগ কর্মকর্তা মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এখন পুরোপুরি লোকসান দিয়ে উৎপাদন চালু রাখতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চমূল্যের ব্যাংক ঋণ। এভাবে আরও কিছুদিন চলতে থাকলে শিল্পমালিকেরা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘ইস্পাত ও সিমেন্ট কারখানার উৎপাদন ৪০-৫০ শতাংশ নেমেছে। তবে কয়েক দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। উৎপাদনও অনেকটা বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমরাও আমাদের মতো করে চেষ্টা করছি।’

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট