চট্টগ্রামে চলতি বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসে। বছরের প্রথম আট মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৩৬ জন। এরমধ্যে শুধু আগস্টেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। যা মোট আক্রান্তের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এর আগের মাস জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৩৬ জন। যা এক মাসের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে ১২৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ডেঙ্গু প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে জেলায় মোট ৮৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। যারা সকলেই বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। কিন্তু আগস্ট মাসে এসে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে জেলায় মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আগস্টেই মারা গেছেন দু’জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
মৃত্যু হওয়া ব্যক্তির নাম জাফর আহমেদ (৫০)। নগরীর বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এদিকে, বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগস্টের মতো পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়তে পারে। এ জন্য দ্রুত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং নগর ও উপজেলা পর্যায়ে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র নগরীতেই ডেঙ্গু বিস্তার ঘটেনি। এবার ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটছে জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও। এ পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে ৮৭২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সীতাকুণ্ড ২৪২ জন এবং কর্ণফুলীতে ১৫৬ জন। এছাড়া পটিয়ায় ৫২, রাউজানে ৫০, আনোয়ারায় ৪৯, লোহাগাড়ায় ৪৮, রাঙ্গুনিয়ায় ৪১, সাতকানিয়ায় ৩৭, হাটহাজারীতে ২৬, মীরসরাইয়ে ২৫, বোয়ালখালীতে ২৩, চন্দনাইশে ২৩, ফটিকছড়িতে ১৭ এবং স›দ্বীপে ১২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে, জেলায় এ পর্যন্ত আক্রান্ত ২ হাজার ৩৬ জনের মধ্যে ১ হাজার ৮৮৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৫১ জন। সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৯৪১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৮৮ জন। এছাড়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে মোট ২৬৮ জনের মধ্যে ১৭ জন এবং বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়া ১৪১ জনের মধ্যে বর্তমানে ১৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৮৩ জন, যা মোট রোগীর ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ। নারী আক্রান্ত হয়েছেন ৫৫৪ জন বা ২৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং শিশু ৩৯৯ জন বা ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। ডেঙ্গুতে মৃত পাঁচজনের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও দু’জন নারী।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, আগস্টের অবিরাম বৃষ্টিপাত ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। শুধু মহানগর নয়, সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলীর মতো শিল্প ও উপশহর এলাকাতেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। আগস্টের এই পরিসংখ্যানকে সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে নগর ও গ্রাম- দুই পর্যায়েই সমন্বিতভাবে আমরা মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ, মাইকিং প্রোগ্রামসহ বিভিন্ন প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছি। তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তারেক শামস বলেন, আগস্টের শেষভাগে ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক রোগী শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসছেন। যা বিপদজনক। তাই জ্বর হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো জরুরি। যদি পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে, তাহলে বিপদজনক চিহ্নগুলো থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। এটি নিয়ে কোনভাবে অবহেলা করা যাবে না।
পূর্বকোণ/নুসরাত


















