চট্টগ্রাম রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

‘এ স্ট্রং উইমেন’ আর ফিরবে না, থেমে গেল বাবার স্বপ্নও

‘এ স্ট্রং উইমেন’ আর ফিরবে না, থেমে গেল বাবার স্বপ্নও

তাসনীম হাসান

২৩ আগস্ট, ২০২৬ | ১২:৫৪ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশেই মর্গ। সেখানে একটি স্ট্রেচারের ওপর শুয়ে আছেন নাফিসা নাওয়াল। চোখ দুটি পলকহীন। একসময় যে চোখে ছিল স্বপ্ন, সেই চোখ নিস্তব্ধ। ঠাণ্ডা হয়ে আসা শরীরটা পড়ে আছে নিরব-নিথর। সাদা ইউনিফর্ম রক্তে ভেজা। ‘আপনার মেয়ে এখানেই।’ কথাটা শুনে হন্তদন্ত হয়ে মর্গের দরজার সামনে এসে দাঁড়ান মামুন মিয়া। একটু উঁকি দেন ভেতরে। তারপরই চোখ আটকে যায় মেয়ের নিথর শরীরে। যে মেয়েকে সকালে ঘরে রেখে অফিসের পথে বেরিয়েছিলেন, সেই চিরচঞ্চল মেয়েটাই কিনা চিরদিনের জন্য শুয়ে আছে! পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই মানুষটির চোখে-মুখে মুহূর্তেই ভেসে ওঠে এক বিধ্বস্ত বাবার ছবি। এতক্ষণ বুকের ভেতর আটকে রাখা কান্না আর ধরে রাখতে পারলেন না। একজন সাংবাদিক মুখের সামনে বুম ধরতেই ভেঙে পড়েন তিনি। চোখের জলে ভিজে ওঠে দুগাল। কাঁপা কণ্ঠে বলেন, ‘ওকে নিয়ে কত আশা-ভরসা ছিল। ওর পড়াশোনা নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল। আমার জীবনের সবকিছুই শেষ।’

সেই ‘সবকিছু’ই ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, আদরের রাজকন্যা নাফিসাকে ঘিরে। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই সেই মেয়েকেই কেড়ে নিল সড়ক দুর্ঘটনা। গতকাল শনিবার সকালে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় কাটগড়ের নেভি হাসপাতাল গেট এলাকায় মোবাইল ক্রেনের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়েন নাফিসা। এরপর মুহূর্তেই সেই ক্রেনের চাকার নিচে চলে যায় তার শরীর। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। এদিন ছিল তার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের পরীক্ষা। পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল হাজি মুহাম্মদ মহসিন কলেজ কেন্দ্রে। পতেঙ্গার বাসা থেকে রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে করে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু পরীক্ষার হলে পৌঁছানোর বদলে চলে গেলেন এমন এক ঠিকানায়, যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরবেন না। দুর্ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল তার নিবন্ধন কার্ড, পরিচয়পত্র। নাফিসা ছিলেন সিএমপি স্কুল এন্ড কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী। মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানার কোয়ালিটি ইনচার্জ বাবা মামুন মিয়া ছুটে আসেন হাসপাতালে। স্বজনেরা খবর দেন মা মুক্তা বেগমকে। হাসপাতালে এসে মেয়ের নিথর শরীর দেখে আর্তনাদে ভেঙে পড়েন তিনিও। নাফিসা যে তাদের কাছে শুধু একজন সন্তান ছিলেন না-ছিলেন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। অথচ সেই উপহারটিই এক মুহূর্তে কেড়ে নিল সড়ক।

নাফিসার ফেসবুক বায়োতে লেখা ছিল-‘এ স্ট্রং উইমেন’। সাহসী মেয়েটিকে ঘিরে বাবার স্বপ্নও ছিল অনেক বড়। সেই স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন মামুন মিয়া, ‘এইচএসসি পরীক্ষার পর ও ডিফেন্সে (সামরিক বাহিনীতে) যোগ দেবে-এই স্বপ্ন দেখছিলাম। মেয়েও সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরীক্ষার আর কয়েকটি দিন বাকি। তার আগেই কিনা ও চলে গেল, আমাকে সারাজীবনের জন্য শূন্য করে।’ হাসপাতালে তখন শুধু বাবার কান্না নয়, মায়ের আহাজারিতেও ভারী হয়ে উঠে চারপাশ। মুক্তা বেগম বলতে থাকেন, ‘আমার মেয়েটাকে ছোট থেকে কত কষ্টে এত বড় করলাম। আমার সেই জলজ্যান্ত মেয়েটাই নাই হয়ে গেলো।’

আনোয়ারা সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আল আমিনের কাছে পড়তেন নাফিসা। এই শিক্ষকের কাছে নাফিসা শুধু একজন ছাত্রী নন, ছিলেন পরিবারেরই একজন। পূর্বকোণকে তিনি বলেন, ‘ও এতটা নম্র-ভদ্র আর মিশুক মেয়ে ছিল, বলে বোঝানো যাবে না। নিয়মিত বাসায় পড়তে আসায় আমি ও আমার স্ত্রীর সঙ্গে ওর পরিবারের ভালো সম্পর্ক ছিল। ও ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আইসিটি পরীক্ষা শেষে বিকেলে আমার কাছে হিসাব বিজ্ঞান পড়তে আসার কথা ছিল। সেই মেয়েটাকেই আর দেখবো না-ভাবতেই বড় শূন্য শূন্য লাগছে।’

নাফিসাদের গ্রামের বাড়ি বরগুনায়। তবে বাবার কর্মসূত্রে তারা থাকতেন চট্টগ্রামে। পতেঙ্গার চৌধুরীপাড়া এলাকায় মামা বাড়ি করেছেন। সেই বাড়িতেই থাকতেন নাফিসা ও তার বাবা-মা। শনিবার দুপুর ২টার দিকে নাফিসার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সেই বাড়িতে। জলোচ্ছ্বাসের মতো গোটা এলাকা যেন ভেঙে পড়ে বাড়ির সামনে। যে বাড়িতে এতদিন ছিল নাফিসার হাসি, কোলাহল-সেই বাড়ির উঠানেই তখন শুধু কান্নার শব্দ। এরপর পড়ন্ত বিকেলে সবার চোখের জল পেরিয়ে নাফিসার মরদেহবাহী এম্বুলেন্স ছুটে যায় বরগুনার উদ্দেশ্যে। দুই বছর আগে সিএমপি স্কুল এন্ড কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর কলেজের ফেসবুক গ্রুপে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন নাফিসা। কলেজ সম্পর্কে সবার কাছে জানতে চেয়েছিলেন। একের পর এক মন্তব্য এসেছিল। প্রতিটি মন্তব্যের জবাবে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন নাফিসা। কী আশ্চর্য-দুই বছর পর সেই একই গ্রুপেই ভেসে উঠল তার মৃত্যুসংবাদ। কিন্তু কারও শোকবার্তার জবাব আর দেবেন না নাফিসা, কোনোদিনও না!

পূর্বকোণ/আদর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট