চট্টগ্রাম সোমবার, ০৩ আগস্ট, ২০২৬

একের পর এক হত্যা ঘটিয়ে চললেও পুলিশ ‘খোঁজ পায়নি’ রায়হানের

একের পর এক হত্যা ঘটিয়ে চললেও পুলিশ ‘খোঁজ পায়নি’ রায়হানের

নাজিম মুহাম্মদ

৩ আগস্ট, ২০২৬ | ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

কথায় কথায় গুলি করেন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান। ব্যবহার করেন ভারী অস্ত্র। একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটালেও তার খোঁজ পায়নি নগর ও জেলা পুলিশ। গত বছরের ২২ এপ্রিল রায়হানকে গ্রেপ্তারের জন্য রাউজানে অভিযান চালায় নগর পুলিশ। যে রাতে অভিযান চলে তার পরদিন যে যুবক পুলিশকে খবর দিয়েছিল তাকে বাসার সামনে সদলবলে এসে দিনে দুপুরে গুলি করে হত্যা করেন রায়হান। এরপর থেকে মূলত রায়হানকে গ্রেপ্তারে আর অভিযানে যায়নি পুলিশ।

 

রায়হান (৩৫) রাউজানের দক্ষিণ পূর্ব রাউজানের ৮ নং ওয়ার্ডের জুরুরকূল মুন্দার খলিফার বাড়ির বদিউল আলমের ছেলে। বাকলিয়ায় জোড়া খুন, বায়েজিদে সরওয়ার হত্যা, পতেঙ্গায় ঢাকাইয়্যা আকবর হত্যা, রাউজানে মাকসুদ হত্যা ও ইব্রাহিম হত্যাসহ নগর ও জেলায় ১৩ মামলার আসামি।

 

তবে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাসুদ আলম জানিয়েছেন, গত ৫ জুলাই যখন ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার অভিযান চলছিল, ঠিক একই সময়ে আরেক কুখ্যাত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অবস্থান করছিল। তিনি বলেন, আমাদের আরেকটি টিম নোয়াখালীতে অবস্থান করছিল। টিভি স্ক্রলে যখন আসে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার’ তখন আমাদের ওই টিম দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যায় রায়হান। তবে রায়হানদের গ্রুপ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে।

 

ইব্রাহিম হত্যার পর অভিযানে যায়নি পুলিশ: গত বছরের ২১ এপ্রিল রাতে রায়হানকে গ্রেপ্তার করতে পূর্ব রাউজানে অভিযান চালায় নগর পুলিশের একটি দল। অভিযানে থাকা এক পুলিশ সদস্য জানান, রায়হান খুবই দুর্ধর্ষ। এক সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে আমরা রাউজানে তাকে ধরতে রাতভর অভিযান চালাই। তার আস্তানার কাছাকাছিও পৌঁছেছিলাম। কিন্তু এর মধ্যে সে পালিয়ে যায়। যে সোর্স খবর দিয়েছিলো তাকে পরদিন দুপুরে গুলি করে হত্যা করে তারা। মূলত ওই ঘটনার পর থেকে রায়হানকে গ্রেপ্তার করতে তেমন অভিযান হয়নি।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাউজানের ৮ নং ওয়ার্ডের শমসের নগর আদর্শ গ্রামের মো. আলমের ছেলে ইব্রাহিম (২৬)। সে মূলত পুলিশকে খবর বলেছিল। বিষয়টি জানতে পারেন রায়হান। ইব্রাহিম হত্যায় গত বছরের ২২ এপ্রিল রাউজান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন তার মা খালেদা বেগম (৬০)। মামলায় রায়হানসহ আটজনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন, ইলিয়াছ প্রকাশ ধামা ইলিয়াছ, মো. আলী, মো. খোরশেদ, মো. বাচা, মো. আইয়ুব, মো. আলতাফ ও এস এম শহিদুল্লাহ রনি। ইলিয়াছ ছাড়া বাকিদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

 

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ইব্রাহিম অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন। রায়হানদের কর্মকান্ডের বিরোধী ছিলেন। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দুপুর একটায় ইব্রাহিম সাত নম্বর রাউজান ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের গাজি পাড়া আবুল মার্কেটের সামনে রাস্তার উপর দাঁড়িয়েছিল। এ সময় তিনটি সিএনজি ট্যাক্সি নিয়ে রায়হান সদলবলে হাজির হন। তারা ইব্রাহিমকে চারপাশে ঘিরে ধরেন। প্রথমে মারধর করেন। এক পর্যায়ে রায়হান ও ধামা ইলিয়াছ ইব্রাহিমের মাথার পিছনে, পিঠে, কোমরে, নাভির নিচে এবং ডান পায়ের রানে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেন। ইব্রাহিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন রায়হান।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রায়হানের নামে নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বাকলিয়ায় জোড়া খুন, বায়েজিদে সরওয়ার হত্যা, পতেঙ্গায় ঢাকাইয়্যা আকবর হত্যা, রাউজানে মাকসুদ হত্যা ও ইব্রাহিম হত্যা উল্লেখযোগ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রায়হান প্রসঙ্গে জানিয়েছে, সম্প্রতি রায়হান ৩০ লাখ টাকায় প্রাইভেট গাড়ি কিনেছে। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে প্রচুর ভারী অস্ত্রও কিনেছে রায়হানের গ্রুপ।

 

বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী ২০০০ সালে চট্টগ্রাম নগরে বহুল আলোচিত আট ছাত্রলীগ নেতা খুনের মামলার আসামি ছিলেন। মামলার রায়ে তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হলেও পরে উচ্চ আদালত থেকে খালাস পান তিনি। সাজ্জাদ আলীর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ ১৭টি মামলা রয়েছে। তিনি বিদেশে পালিয়ে থাকলেও তার হয়ে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও ও হাটহাজারী এলাকায় অপরাধ কর্মকান্ড পরিচালনা করার অভিযোগ রয়েছে ছোট সাজ্জাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে। বর্তমানে কারাগারে থাকা ছোট সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম রায়হান।

 

পুলিশ জানায়, হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় কারাগারে গিয়ে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয় হয় রায়হানের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দু’জন কারাগার থেকে জামিনে বের হন। এরপর ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রায়হান। সাজ্জাদ সম্প্রতি আবারও কারাগারে গেলে তার অস্ত্রভাণ্ডারের দেখভাল করছেন এই রায়হান।

 

গত ২৩ মে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ‘সন্ত্রাসী’ আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে প্রকাশ্যে গুলি করে খুনের মামলার আসামি করা হয় রায়হানকে। আকবর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বলেও যান- ‘তাকে গুলি করেছে রায়হান।’

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট