চট্টগ্রাম রবিবার, ০২ আগস্ট, ২০২৬

বন্ধু নেই, আছে বন্ধুত্ব!

বন্ধু নেই, আছে বন্ধুত্ব!

বন্ধু দিবস আজ

তাসনীম হাসান

২ আগস্ট, ২০২৬ | ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ

একজন মানুষ মারা গেলে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো একে একে স্মৃতি হয়ে যায়। জামাকাপড়, ছবি, ব্যবহারের জিনিস-সবই। কোনো কোনো জিনিসে লেগে থাকে তার স্পর্শ, কোনো ছবিতে আটকে থাকে হাসি, কোনো পুরোনো কথায় ফিরে আসে তার কণ্ঠ। কিন্তু বন্ধুত্ব কি স্মৃতি হয়ে যায়? ইয়াসিন আরিফের বন্ধুরা বলছেন, যায় না!
১৯ জুনের বিষন্ন সকাল কেড়ে নিয়েছে এই তরুণের প্রাণ। সড়ক দুর্ঘটনায় চিরতরে হারিয়ে গেছেন ইয়াসিন আরিফ। বন্ধু নেই, আসবেন না কোনোদিন। তবে তার বাসার দরজায় বন্ধুরা এখনও কড়া নাড়েন। কখনো রান্না করা খাবার হাতে, কখনো তার ছোট্ট সন্তানের জন্য খেলনা নিয়ে।

ইয়াসিন আরিফের অভিন্ন-হৃদয় বন্ধুদের একজন মোহাম্মদ আলম ছিদ্দিক। ১৯৯৬ সালে প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় শুরু হয়েছিল তাদের বন্ধুত্ব। প্রাথমিক থেকে কলেজ—এক বেঞ্চে পাশাপাশি বসা, মোটরবাইকে ঘুরতে যাওয়া, কত শত রাত আড্ডায় পার—জীবনের দীর্ঘ সময় যেন পাশাপাশি হেঁটেছেন দু’জন।
বন্ধুর কথা বলতে গিয়ে গলা শুকিয়ে আসে মোহাম্মদ আলম ছিদ্দিকের। টুকরো টুকরো মেঘের মতো কত ঘটনা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, ‘মনে হয়েছিল, এই দিনগুলো বুঝি কখনো ফুরোবে না। সবকিছু ঠিক একই নিয়মে চলছিল। মাঝখানে আমার বন্ধুটাই নাই হয়ে গেল। চেষ্টা করি বন্ধুর পরিবারের পাশে থাকতে।’

আরিফ প্রতিদিন বাসার পাশের একটি জুসের দোকানে নিজের মেয়ে ও ভাগিনা-ভাগ্নিদের গাড়িতে করে নিয়ে আসতেন। তাদের জুস খাওয়াতেন। বাসায় ফেরার সময় মা ও স্ত্রীর জন্য নিয়ে যেতেন পুদিনা-লেবুর শরবত। মানুষটি নেই বলে কি সেই আয়োজন থেমে থাকবে?
আরিফের বন্ধুদের আরেকজন মেহেদী হাসান পার্থর কণ্ঠে বড় ভাইতুল্য বন্ধুকে হারানোর শূন্যতা, আবার সেই শূন্যতা পূরণের অসম্ভব এক চেষ্টা-‘ভাই নেই, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি ভাইয়ের অভাব পূরণ করার। জানি, সেটি সম্ভব নয়। তারপরও চেষ্টা তো করতে পারি।’

ইয়াসিন আরিফের স্ত্রী ইসমত আরা জেকির মুখে তাই কেবল স্বামীর শোক নয়, আছে তার বন্ধুদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাও। তিনি বলেন, ‘আরিফ বন্ধুদের ছেড়ে সে এক মুহূর্তও থাকতে পারত না। এখন সেই বন্ধুরাই আমাদের আগলে রেখেছেন। সব প্রয়োজনে পাশে থাকছেন তারা। ছুটির দিনে গ্রামে গিয়ে আরিফের কবর জিয়ারত করছেন, আয়োজন করছেন দোয়া মাহফিলের। ওরা নিজ থেকে আমাদের পাশে যেভাবে থাকছে, এই যুগে নিজের রক্তের সম্পর্কের মানুষেরাও অনেক সময় তা করে না।’

কোহিনূর বেগম নিজের চেয়েও প্রিয় ছোট ছেলেকে হারিয়েছেন নির্মমভাবে। শেষবারের মতো ছেলের মুখটিও দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। এরপর নিজের গণ্ডির মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে তার জীবন। এখনও প্রায় প্রতিদিনই বাসার বাইরে ভেসে আসে এই মায়ের কান্নার শব্দ। কোহিনূর বেগম সেই মা, যিনি আট বছর আগে রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইদুর রহমান পায়েলকে হারিয়েছেন।

পায়েলের জীবন থেমে গেছে ২১ বছরের আশপাশের বয়সে। সময়ের সঙ্গে তার বন্ধুদের কেউ পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকেছেন, কেউ বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন, কেউ পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। জীবন তাদের যে যার মতো দূরে নিয়ে গেছে। কিন্তু বিশেষ দিনগুলোতে তাদের ঠিকানা এখনও এক—পায়েলের বাসা। ছেলের বন্ধুদের দেখলে কোহিনূর বেগমের দুঃখ কিছুটা হলেও হালকা হয়।

পায়েলের সেই বন্ধুদের একজন মাকসুদুল হাসান রাকিবের কাছে জানতে চাইলে যেন ফিরে যান আদর গায়ে মাখা সেইসব বিকেলে-যেসব বিকেলে ছিল বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা, গল্প, ঘোরাঘুরি। রাকিব বলেন, ‘একসঙ্গে বড় হওয়া, আড্ডা, ঘোরাঘুরি-কত শত স্মৃতি। চাইলেই তো এসব ভোলা যায় না। ছোট ছেলেকে হারিয়ে আন্টি-আঙ্কেল ভেঙে পড়েছেন। আমরা চেষ্টা করি তাদের কাছে গিয়ে সেই দুঃখটা একটু হলেও ভোলাতে।’ এক বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে সহস্রধারার জলধারায় ডুবে মারা যায় মো. তাসিন আনোয়ার। তখনও এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল এই কিশোর। ফল প্রকাশের পর জানা গেল, তাসিন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ছেলের এই সাফল্যের খবর যেখানে বাবা-মায়ের ঘরে আনন্দের আলো জ্বালানোর কথা ছিল, সেখানে তা হয়ে এল বুকের ভেতর বিঁধে থাকা আরেকটি শেল।

একমাত্র ছেলেকে হারানোর সেই শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি বাবা প্রকৌশলী মো. আনোয়ার কবির। তাই মাঝে মাঝে তিনি ছেলের বন্ধুদের ডেকে পাঠান। বন্ধুরাও আসেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তারা তাসিনের গল্প করেন, পুরোনো স্মৃতি বলেন। আর একজন সন্তান হারানো বাবা তাদের মাঝেই যেন খুঁজে ফেরেন নিজের ছেলেকে।
প্রকৌশলী মো. আনোয়ার কবির বলেন, ‘ছেলেকে হারানোর দুঃখের যে দীর্ঘশ্বাস, সেটি তো কখনো ফুরাবে না। মাঝে মাঝে তার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি, ওরাও আসে আমাদের কাছে। ওদের দেখলে ছেলের কথা আরও বেশি মনে পড়ে।’

মানুষ চলে যান, স্মৃতি থেকে যায়। আর কোনো কোনো বন্ধুত্ব মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে-বন্ধুর পরিবারে, পুরোনো আড্ডায়, কিংবা হারানো সন্তানের বন্ধুর মুখে।

আজ বন্ধু দিবসে অমলিন বন্ধুত্বের এই গল্পগুলো যেন মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর গান-‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়। ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়!’

পূর্বকোণ/আদর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট