চট্টগ্রাম শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

ভাণ্ডালজুুড়ির পানি যাবে পতেঙ্গা-কাট্টলী

ওয়াসার ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প

ভাণ্ডালজুুড়ির পানি যাবে পতেঙ্গা-কাট্টলী

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

৩১ জুলাই, ২০২৬ | ৪:০১ অপরাহ্ণ

কর্ণফুলী নদী তীরে গড়ে তোলা বোয়ালখালীর ভাণ্ডালজুুড়ি পানি শোধনাগার প্রকল্পের পানি নগরীর পতেঙ্গা ও কাট্টলী এলাকায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে ওয়াসা। এজন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। মূলত দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় পানি সরবরাহ করার লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে জ্যৈষ্ঠপুরা এলাকায় ভাণ্ডালজুুড়ি পানি শোধনাগারটি নির্মাণ করে ওয়াসা। দৈনিক ছয় কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে প্রকল্পটির। কিন্তু প্রত্যাশিত গ্রাহক না পাওয়ায় সক্ষমতা কমিয়ে মাত্র ২৫ লাখ লিটার পানি উৎপাদন করে আসছে। সমীক্ষার ভুলের কারণে কাক্সিক্ষত গ্রাহক না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এখন নগরীতে আনার পরিকল্পনার মাধ্যমে সেই ভুল শোধরাতে চায় ওয়াসা।

বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম ওয়াসার এমডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর নগরীর পানির চাহিদা বাড়ানোর নানা পরিকল্পনা নিয়েছেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভাণ্ডালজুুড়ি প্রকল্পের পানি পতেঙ্গা-কাট্টলী আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের পানি উৎপাদন সক্ষমতা ৬ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১০ কোটি লিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীর ‘পতেঙ্গা ও কাট্টলীর লবণাক্তপ্রবণ এলাকায় পানি সরবরাহ উন্নতি ও গ্রাহক সুবিধা বৃদ্ধি’ প্রকল্প নিয়েছে ওয়াসা। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ কোটি ৯৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি বছরের আগস্ট থেকে ২০২৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত। প্রকল্পে রয়েছে নতুন পাইপলাইন স্থাপন ও সম্প্রসারণ। গ্রাহকসেবার উন্নয়নে অফিস স্থাপন।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম পূর্বকোণকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। আশা করি, প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে সমস্যা হবে না। এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের টাকা ধরা রয়েছে। অনুমোদন হওয়ার পরপরই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে।’

ওয়াসা জানায়, বোয়ালখালীর ভাণ্ডালজুুড়ি পানি শোধনাগার প্রকল্পের পাইপলাইন আনোয়ারা সিইউএফএল এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ কর্ণফুলী টানেল এলাকার কাছাকাছি পর্যন্ত রয়েছে। কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে কর্ণফুলী টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করে নগরীর পতেঙ্গা ও কাট্টলী এলাকায় পানি সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এলক্ষ্যে টানেলের ভেতরে পাইপলাইন স্থাপনের অনুমতি চেয়ে সেতু বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

ওয়াসা, বিদ্যুৎ, টিএন্ডটির মতো সেবা সংস্থাগুলোর জন্য কর্ণফুলী টানেলের পাটাতনের নিচে ইউটিলিটি ডাক্ট প্রস্তুত করা আছে। কিন্তু সেটি এখনো ব্যবহার হয়নি। প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম ওয়াসা টানেলের ডাক্ট (টানেলের ভেতরের লম্বা পাইপ বা চ্যানেল সিস্টেম) ব্যবহার করে ওপারের পানি এপারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে।

এ বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, ‘সেতু মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়েছে। টানেল ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার পর পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শুরু হবে।’ চট্টগ্রাম নগরীর পানির সংকট তীব্র ছিল। দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্প-কারখানা ও আবাসিক এলাকায় পানি সরবরাহ করার লক্ষ্য নিয়ে ভাণ্ডালজুুড়ি পানি শোধনাগার প্রকল্প নিয়েছিল ওয়াসা। কিন্তু প্রকল্পের সমীক্ষার ভুলের কারণে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি ওয়াসা। ৯৫ শতাংশ পানি অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। আর অপরদিকে নগরীতে পানি সংকট দিন দিন বেড়েই চলেছে। সমীক্ষার ভুলের মাশুল দিতে এখন ভাণ্ডালজুুড়ি প্রকল্পের পানি নগরীর পতেঙ্গা ও কাট্টলীতে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে ওয়াসা।

ওয়াসা সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে এক হাজার ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরে কর্ণফুলী নদীর তীরে ভাণ্ডালজুুড়ি এলাকায় এই পানি পরিশোধন প্রকল্প নেওয়া হয়। কয়েক দফায় খরচ বাড়িয়ে ২০২৩ সালে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় এক হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকায় ১০ হাজার আবাসিক সংযোগের পাশাপাশি সিইউএফএল, কাফকো, কোরিয়ান ইপিজেড ও আনোয়ারা ইকোনমিক জোনসহ ১৩টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পানির চাহিদা মেটানো হবে এই প্রকল্প থেকেই। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পর কাক্সিক্ষত গ্রাহক পায়নি ওয়াসা। ফলে দৈনিক ছয় কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও ২৫ লাখ লিটারের বেশি পানি বিক্রি করতে পারছে না ওয়াসা।

পানি উৎপাদন ১০ কোটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা :
বোয়ালখালীর ভাণ্ডালজুুড়ি প্রকল্পের পানি উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ৬ কোটি লিটার। ওই প্রকল্পের পানি নগরীতে আনার পরিকল্পনার পর পানির চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। নগরী ছাড়াও আনোয়ারা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে। এই প্রকল্পে প্রচুর পরিমাণ পানির প্রয়োজন রয়েছে। শিল্প-কারখানা ও আবাসিক গ্রাহকের কথা চিন্তা-ভাবনা করে প্রকল্পটিকে ১০ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।

চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, ‘পতেঙ্গা, কাট্টলী ও হালিশহর এলাকায় প্রচুর পানির চাহিদা রয়েছে। পতেঙ্গা নৌবাহিনীরও পানির চাহিদা রয়েছে। এছাড়া আনোয়ারা চায়নিজ ইকোনমিক জোনেও পানির চাহিদা মেটাতে হবে। তাই সবমিলে ভাণ্ডালজুুড়ি প্রকল্পকে ৬ কোটি লিটার থেকে বাড়িয়ে ১০ কোটি লিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

গ্রামের পানি শহরে: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ৩৯, ৪০ ও ৪১নং তিনটি ওয়ার্ড দীর্ঘদিন ধরে তীব্র পানি সংকটে ছিল। সাগর-তীরবর্তী এই তিনটি ওয়ার্ডের পানি লবণাক্ত। সুপেয় পানির হাহাকার চলে আসছিল। শহরের বাসিন্দা হয়েও এসব এলাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ থেকে বঞ্চিত ছিল। ৩৯ ও ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের অর্ধেক এলাকায় ওয়াসার লাইন থাকলেও পানি স্বল্পতার কারণে রেশনিং করে পানি দিতে হচ্ছে। ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়াসার কোনো কার্যক্রমই নেই। এই তিন ওয়ার্ডে দৈনিক ৯ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। নগর থেকে দৈনিক চার কোটি লিটার পানি ওই এলাকার জন্য বরাদ্দ করা সম্ভব। কিন্তু কর্ণফুলী টানেলের ডাক্ট ব্যবহার করে ভাণ্ডালজুুড়ি প্রকল্পের পানি আনা গেলে আরও এক থেকে দুই কোটি লিটার পানির জোগান বাড়ানো যাবে। এতে মানুষের দীর্ঘদিনের পানি সংকট অনেকটা লাঘব হবেচট্টগ্রাম ওয়াসা বর্তমানে চারটি শোধনাগার ও গভীর নলক‚পের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৪৬ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করছে। যা এখনো নগরীর মোট চাহিদার তুলনায় কম।

 

ওয়াসার এমডি সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, ভাণ্ডালজুুড়ি প্রকল্প থেকে দুই কোটি লিটার পানি নগরে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে ওই প্রকল্পের পানি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পর নগরের পানির জোগানও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট