চট্টগ্রাম শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলাদেশ: ভোক্তা নাকি নির্মাতা?

ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ

স্ট্যানফোর্ডের ২০২৬ সালের এআই ইনডেক্স রিপোর্ট বলছে বিশ্ব দ্রুত এগোচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে। তবে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমরা এই পরিবর্তনের দর্শক থাকব, নাকি নিজেদের সক্ষমতা তৈরি করে অংশীদার হব?

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়; এটি ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও সাইবার নিরাপত্তার বাস্তব অংশ। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান সেন্টার্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এইচএআই) প্রকাশিত এআই ইনডেক্স-২০২৬ রিপোর্টের মূল বার্তা দ্ব্যর্থহীন-এআই এর সক্ষমতা থেমে যাচ্ছে না, বরং ত্বরান্বিত হচ্ছে। কিন্তু এআই-কে নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও ব্যাখ্যাযোগ্য করার সক্ষমতা একই গতিতে এগোচ্ছে না। এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

 

সংখ্যাগুলো সে কথাই বলে। ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য এআই মডেলের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে শিল্পখাত থেকে; প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এআই ব্যবহারের হার পৌঁছেছে ৮৮ শতাংশে। বিশ্বের প্রতি পাঁচজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর চারজনই এখন জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছেন। এই দৌড়ের ভিত্তি একটিই- কম্পিউটিং শক্তি। ২০২১ সালের পর বিশ্বে মোট এআই কম্পিউট বেড়েছে ত্রিশ গুণ, আর ইউনেস্কো-ইউএনডিপি-ইইউ প্রস্তুতি মূল্যায়ন বলছে, বাংলাদেশ ভুগছে জিপিইউ সংকটে। প্রশ্নটি তাই আর “এআই আসবে কি না” নয়- বাংলাদেশ কি এআই এর ভোক্তা থাকবে, নাকি নির্মাতা হবে? সেটি।

 

সুসংবাদ হলো, নির্মাতা হতে বিশ্বের বৃহত্তম মডেল বানাতেই হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের এলেন ইনস্টিটিউট ফর এআই এর তৈরি ‘অলমো ৩.১ ৩২বি থিংক’ এর একটি উদাহরণ। মাত্র ৩২ বিলিয়ন প্যারামিটারের এই মডেলটির ওজন, কোড ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং যুক্তিনির্ভর বহু কাজে এটি বহুগুণ বড় বাণিজ্যিক মডেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। ডিপসিক-আর ১ ও দেখিয়েছে, তুলনামূলক কম খরচে শীর্ষ মডেলের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব। বাংলাদেশের জন্য তাই কার্যকর কৌশল হতে পারে ‘স্মল, স্পেশালাইজড এন্ড সাসটেইনেবল এআই’ বা ছোট, নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি, কম শক্তি ব্যবহারকারী এআই। ফসলের রোগ শনাক্তকরণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণে এমন মডেল বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

 

জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে এআই এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আমাদের স্বতন্ত্র গবেষণার ক্ষেত্র হতে পারে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিধসের পূর্বাভাসে সেন্সর, স্যাটেলাইট ডেটা ও এআই একসঙ্গে ব্যবহার করলে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত ক্ষমতা বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত অবকাঠামোর কাঠামোগত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ বা স্ট্র্যাকচারাল হেলথ মনিটরিং (এসএইচএম)। কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতু কিংবা নগরের উচ্চ ভবন-এসব স্থাপনায় স্ট্রেইন, কম্পন, তাপমাত্রা ও স্থানচ্যুতির সেন্সর বসিয়ে মেশিন লার্নিং দিয়ে ধারাবাহিক বিশ্লেষণ করলে ফাটল বা ক্ষয় দৃশ্যমান হওয়ার অনেক আগেই ধরা পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে এই চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে; চীন মহাসড়ক-সেতুর জন্য আলাদা এসএইচএম কারিগরি কোডই প্রণয়ন করেছে।

 

চট্টগ্রামের জন্য কাজটি আজই শুরু করা সম্ভব। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন তাদের আওতাধীন ফ্লাইওভার, উড়ালসড়ক, সেতু ও বহুতল ভবনে পর্যায়ক্রমে এসএইচএম ব্যবস্থা বসাতে পারে। শুরুটা বড় বাজেটের প্রকল্প হতে হবে না- কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সীমিতসংখ্যক সেন্সর এবং স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ ডেটা বিশ্লেষণ দিয়েই পাইলটিং করা সম্ভব। লবণাক্ত বাতাস, ভারী বর্ষণ ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির কারণে দুর্ঘটনার পর তদন্ত করার চেয়ে আগেভাগে পরিমাপ করা সস্তা। নির্মাতা হওয়ার শুরুটা এখানে একটি সেন্সর আর একটি গবেষণা দল দিয়েই সম্ভব।

 

নির্মাতা হওয়া মানে কিন্তু শুধু মডেল বানানো নয়- সেই মডেলের জবাব দিতে পারাও। সাইবার নিরাপত্তাই এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। এআই এজেন্টগুলো জটিল কাজে দ্রুত উন্নতি করছে, কিন্তু তাদের ভুল ও অনিশ্চয়তাও স্পষ্ট হচ্ছে। তাই “এআই আক্রমণ শনাক্ত করেছে”- এটুকু যথেষ্ট নয়। জানতে হবে, কেন এটি আক্রমণ মনে করল, কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিল এবং সিদ্ধান্তটিতে কতটা আস্থা রাখা যায়। এখানেই এক্সপ্লেনেবল এআই বা ব্যাখ্যাযোগ্য এআই এর গুরুত্ব। সুইডেনে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে এই বিষয়ে পাঠদানে যুক্ত থেকে দেখেছি, ইউরোপের গবেষণা ও নিয়ন্ত্রক আলোচনায় প্রশ্নটি আর “মডেলটি কত শতাংশ নির্ভুল” নয়; প্রশ্নটি হলো, সিদ্ধান্তটি আদালতে বা নিরীক্ষায় ব্যাখ্যা করা যাবে কি না।

 

ব্যাখ্যাযোগ্যতা একা সব ঝুঁকি দূর করে না, কিন্তু ক্ষতিটা হয় প্রায়ই অস্বচ্ছতার কারণেই। নেদারল্যান্ডসে শিশু-ভাতা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি ঝুঁকি-নির্ধারণী অ্যালগরিদম প্রায় ২৬ হাজার পরিবারকে ভুলভাবে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করেছিল; বহু পরিবার সর্বস্ব হারায়। এর নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় স্বীকার করে ১৫ জানুয়ারি ২০২১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটের নেতৃত্বাধীন পুরো মন্ত্রিসভা বা সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এআই সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কি না- সেটি নির্ভর করছে যন্ত্রের ইচ্ছার ওপর নয়, আমাদের তৈরি করা জবাবদিহির কাঠামোর ওপর। অর্থাৎ ভোক্তা থেকে নির্মাতা হওয়ার দৌড়ে অংশ নেওয়াই যথেষ্ট নয়; কী ধরনের নির্মাতা হব, প্রশ্নটি সেটিও।

 

তাই বিশ্বাসযোগ্য এবং দায়িত্বশীল এআই এখন আর দার্শনিক আলোচনা নয়, একটি কারিগরি গবেষণা এজেন্ডা- সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তা পরিমাপ, যাতে মডেল “জানি না” বলতে শেখে; ব্যক্তিগত তথ্য কেন্দ্রে না এনে শেখানোর পদ্ধতি (ফেডেরেটেড লার্নিং); পক্ষপাত নিরীক্ষা ও ন্যায্যতা যাচাই; এবং ভুল ধরা পড়লে দায় কার, সেই প্রশ্নের আইনি উত্তর। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এটি বিশ্বমানের গবেষণা ক্ষেত্র, যেখানে বিপুল কম্পিউটিং শক্তি ছাড়াও নির্মাতার আসনে বসা সম্ভব।

 

শিক্ষাক্ষেত্রেও পরিবর্তন গভীর। শিক্ষার্থীর হয়ে এআই যেন চিন্তা না করে; এআই যেন তার বিশ্লেষণ ও গবেষণার ক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই। জাতীয় এআই নীতিমালা ২০২৬-২০৩০-এর খসড়ায় বাংলা ভাষার জাতীয় মডেল তৈরির অঙ্গীকার আছে, কিন্তু উন্মুক্ত ডেটাসেট ও মূল্যায়ন-মানদ- ছাড়া সেটি কাগজেই থেকে যাবে।
স্ট্যানফোর্ডের এআই ইন্ডক্সে-২০২৬ এর বার্তা স্পষ্ট- এআই বিপ্লব অপেক্ষা করছে না। এখন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের: আমরা কি শুধু অন্যের তৈরি এআই ব্যবহার করব, নাকি কৃষক, রোগী, শিক্ষার্থী, সেতু, নদী ও জলবায়ুর বাস্তব সমস্যার সমাধানে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য এআই সক্ষমতা তৈরি করব?

 

এআই-এর যুগে সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো কম্পিউটার নয়- জ্ঞান, দক্ষ মানুষ এবং নিজেদের সমস্যার জন্য নিজেদের সমাধান তৈরির সক্ষমতা।

 

লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের একজন।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট