চট্টগ্রাম শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

একযুগ ধরে অচল সুইমিংপুল   

চট্টগ্রাম সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ সুইমিংপুল

একযুগ ধরে অচল সুইমিংপুল   

হুমায়ুন কবির কিরণ

১৮ জুলাই, ২০২৬ | ১:০৫ অপরাহ্ণ

অতিরিক্ত নগরায়ণের প্রভাবে যেখানে খেলার মাঠ এখন দূর আকাশের চাঁদ, সেখানে শহুরে জীবনে একটি পুকুর বা জলাশয় যেন নিছকই ‘বিলাসিতা’। অথচ নদীমাতৃক এ দেশে সাঁতার না জানার কারণে প্রতিবছর পানিতে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছে হাজারো শিশু-কিশোর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন শিশুর মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে, যার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। যেখানে এক বছরে ২৮২ জন পর্যন্ত পানিতে ডুবে মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে। অথচ এই করুণ মৃত্যু ঠেকাতে যেখানে নগরী ও জেলা-উপজেলায় থাকা সুইমিংপুলগুলো 
অন্যতম হাতিয়ার হতে পারত, সেখানে কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো পড়ে আছে অচল হয়ে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ চট্টগ্রামে হালিশহরের সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজের আন্তর্জাতিক মানের সুইমিংপুলটি, যা গত এক দশক ধরে কেবলই এক পরিত্যক্ত ভাগাড়।
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সংখ্যায় কম হলেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে রয়েছে সুইমিংপুল। নগরী ও আশপাশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অন্তত ১০-১২টি উল্লেখযোগ্য সুইমিংপুল রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও বড় সুইমিং কমপ্লেক্স হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। এর অন্যতম একটি হলো কাজীর দেউড়িতে অবস্থিত জেলা সুইমিং কমপ্লেক্স। আছে বন্দর সুইমিং কমপ্লেক্স। এছাড়া চিটাগং ক্লাব সুইমিংপুল, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী বেইজ জহুর সুইমিংপুল, বেসরকারি পর্যায়ে ফরচুন স্পোর্টস, ফ্রেঞ্জি স্পোর্টস, অক্সিজেন স্পোর্টস জোন, ফয়েজ লেক রিসোর্ট,  রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউ অন্যতম। অধিকাংশ সুইমিংপুলেই সাধারণের সাঁতার শেখার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। নগরীতে অ্যাথলেটদের বিচেনায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুইমিংপুলের একটি জেলা সুইমিং কমপ্লেক্স, অন্যটি ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজের সুইমিংপুল। 
নান্দনিক পরিবেশে ২০০১ সালে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের হালিশহরে সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজটিতে বর্তমানে একটিমাত্র কোর্স, বিপিএড চালু রয়েছে। আসন সংখ্যা ২০০ হলেও ভর্তি রয়েছে ৫০ জন। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য যথাক্রমে ১০০ ও ৫০ আসনের হোস্টেল এবং স্টাফ কোয়ার্টার রয়েছে কলেজটিতে। 
কলেজের আন্তর্জাতিকমানের পুলটি শুরুর সময়ে অন্যতম সেরা একটি সুইমিংপুল। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টির অভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ পুলটি ২০০৯ সালে কার্যক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলে। যার ফলে কলেজের পাঠক্রমে থাকা সাঁতার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় হোস্টেলের সামনে একটি পুকুরে। 
হালিশহর হাউজিং এস্টেটের বড়পুলে অবস্থিত সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজে সাঁতার শেখা এবং অনুশীলনের জন্য সুইমিংপুলে ছিল আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা, ছিল দুটি ড্রেসিংরুম। শুরু থেকেই ঘরোয়া বিভিন্ন আয়োজনে সরগরম থাকা এই পুল প্রথম সংকটে পড়ে ২০০৯ সালে পানি তোলার মোটর বিকল হয়ে গেলে। সেই সময় বৃষ্টির পানি ধরে রেখে পুলের কার্যক্রম চালিয়ে যেতেন কলেজ কর্তৃপক্ষ।
প্রায় ১৬৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬৮ ফুট প্রস্থের এই সুইমিংপুলের গভীরতা প্রায় ৬ ফুট। মোটর নষ্ট হওয়ার পর ৮ লেনের পুলে পানি ধরে রাখাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বর্ষাকালে কিছুটা কর্মক্ষম থাকলেও কয়েকবছরের মধ্যেই মূল পুলের  সারফেইচে ফাটল দেখা দিলে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। কর্তৃপক্ষ কয়েকবার মেরামত করলেও একটা সময় পানিও ধরে রাখা সম্ভব না হওয়ায় ২০১৪ সাল থেকে সুইমিংপুলটি অচল হয়ে পড়ে। 
২০১২ সালে জাতীয় পর্যায়ে আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতাই ছিল পুলটিতে সর্বশেষ বড় কোন আয়োজন। ১৩.১ একর জায়গাজুড়ে কলেজটি অবস্থিত। প্রবেশমুখে বামপার্শ্বের ফুটবল ভেন্যুটি যথেষ্ট নান্দনিক। সিজেকেএস’সহ সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের খেলাধুলা চলে এখানে। বিশাল ক্যাম্পাসে রয়েছে একটি একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, অডিটোরিয়াম, জিমনেসিয়াম এবং সুইমিংপুল। এছাড়াও রয়েছে টেনিস কোর্ট, ব্যাডমিন্টন কোর্ট এবং বাস্কেট বল কোর্ট। কলেজে রয়েছে ৪০০ মিটারের রানিং ট্র্যাক। 
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সুইমিংপুল ও সংলগ্ন পরিবেশ কলেজের ছাত্র/ছাত্রী এবং শিক্ষক কর্মকর্তাদের জন্য অনূকুল নয় মোটেই। দিনের বেলায় যেমন তেমন, সন্ধ্যার পর মশা’সহ ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের কারণে দাঁড়িয়ে থাকাই যে কারও জন্য চ্যালেঞ্জের। কলেজেরই কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, দ্রুতই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সুইমিংপুলটি সংস্কারেরও অযোগ্য হয়ে পড়বে। নিয়মিত সাঁতার কার্যক্রম সম্পর্কে কয়েকজন জানালেন, শিক্ষকগণ আমাদের জন্য সর্বোচ্চটুকু করছেন। আমাদের সাঁতার ইভেন্টের সকল কার্যক্রম চলে পুকুরে। সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে দ্রুতই এই সুইমিংপুল সংস্কারের অনুরোধ জানান তারা। বর্তমানে কলেজটি ৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। 
প্রসঙ্গত. বাংলাদেশে বর্তমানে দেশে ছয়টি সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ রয়েছে যা ক্রীড়া পরিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়। চট্টগ্রামের কলেজটি ছাড়া অন্যগুলো হচ্ছে, সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ ঢাকা, সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ রাজশাহী, সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ ময়মনসিংহ, সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ সিলেট, ও সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ বাগেরহাট। 

সুইমিংপুলটি সাঁতার শেখার উপযোগী করে গড়ে তোলা সময়ের দাবি
আছলাম মোরশেদ
সাবেক নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন

যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম শারীরিক শিক্ষা কলেজের সুইমিংপুল নির্মাণ করা হয়েছিল, তা একেবারেই পূরণ হয়নি। প্রায় ১৫ বছরের অধিক সময় পুলটি অচল এবং পরিত্যক্তাবস্থায় থাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন বড় ক্ষতি তেমনই অ্যাথলেটসহ সাধারণেরও।

 

২০০৩ সালে চালু হওয়ার পর ২০০৯ সালেই প্রায় থমকে যাওয়ায় এই পুলে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। সুইমিংপুলটি পুরোপুরি সংস্কার করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা এবং শারীরিক শিক্ষা কলেজের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি ছাত্র, শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখার উপযোগী করে গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

 

সংস্কার শেষে কলেজের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পর এটি প্রতিদিন ৬/৭ ঘণ্টা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিলে কলেজ ও ব্যবহারকারীরা উপকৃত হবে। একটি সুইমিংপুলের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানো। এই ব্যয় মেটানো দূরহ হয় বলেই দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ সুইমিংপুল বন্ধ অথবা অনুপোযোগী হয়ে পড়ে আছে।
বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ দিলে সবসময় সুইমিংপুল ব্যবহার উপযোগী থাকবে। রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল খরচ বাণিজ্যিক ব্যবহারের ফলে নির্বাহ করা সহজ হবে। সুবিধা হিসাবে বিশেষ প্রয়োজনে সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে ধর্ণাও দিতে হবে না। পানিতে ডুবে দুঃখজনক মৃত্যুর হার বাড়ছে। বিশাল এলাকায় শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখার পথ উন্মুক্ত হলে ছাত্র/ছাত্রী, শিশু-কিশোররা সাঁতার শিখতে পারবে। অবুঝ শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠাও কমে আসবে।

 

পৃথক বাজেট না থাকায় সংস্কারও করা যাচ্ছে না
এস এম গিয়াস উদ্দীন বাবর
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ , চট্টগ্রাম শারীরিক শিক্ষা কলেজ

চট্টগ্রামের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুইমিংপুল অত্যন্ত জরুরি। শারীরিক কলেজের নিয়মিত রুটিনের অংশ হিসাবেও এর বিকল্প নেই। কিন্তু সংস্কারের অভাবে এই পুলটি দীর্ঘদিন ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে আছে। পৃথক কোন বাজেট না থাকায় সংস্কারও করা যাচ্ছে না।

 

ক্রীড়া পরিদপ্তরের পরিচালক সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগ দিয়ে প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করে ফাইল মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছেন। মন্ত্রণালয় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সংশ্লিষ্ট মহলের আন্তরিকতায় পুলটি সচল হলে কলেজের ছাত্র/ছাত্রীরা দারুণ উপকৃত হবে। একইসাথে এলাকার তরুণ/তরুণীদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থাও করা যায়। আমার ইচ্ছা, এই সুইমিংপুলটি কার্যক্ষমতা ফিরে পেলে স্বচ্ছলরা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে সাঁতার শিখবে আর যারা কিছুটা পিছিয়ে তাদের বিনামূল্যেই প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করবো।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট