চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

চামড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আড়তদাররা

চামড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আড়তদাররা

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

১৩ জুন, ২০২৬ | ১২:৫৭ অপরাহ্ণ

লবণযুক্ত চামড়া নিয়ে এবার দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আড়তদাররা। কোরবানি ঈদের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও ক্রেতার দেখা মিলছে না। তবে আড়তদার নেতারা বললেন, ঢাকা থেকে দু-একজন ট্যানারি মালিক আসলেও তারা দাম হাঁকাচ্ছেন সরকারি দরের অর্ধেক।

কোরবানির দিন পাড়া-গাঁ থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া আড়তে এনে বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে খালি হাতে ফিরে গেছেন অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী। ২০১৯ সাল থেকে চামড়া খাতে নৈরাজ্য চলে আসছে।

চট্টগ্রামে এবার কোরবানি পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৪০টি। এরমধ্যে গরুর চামড়া ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০টি। ছাগলের চামড়া ৫৩ হাজার ৮০০টি। বাকিগুলো মহিষের।

২০১৯ সালে করোনা মহামারীর পর চট্টগ্রামে বড় ধাক্কা লাগে। ওই বছর কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দেয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন রাস্তা থেকে দেড় লক্ষাধিক চামড়া কুড়িয়ে নিয়ে ডাম্পিং করেছিল। পরের

বছরও (২০২০ সাল) একই অবস্থা হয়েছিল। এরপর থেকে চামড়া ব্যবসায় ধীরে ধীরে ধস নামতে থাকে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘ঢাকার ট্যানারি মালিক বা ক্রেতা আসছে না। কয়েকজন ক্রেতা আসলে দাম হাঁকাচ্ছেন ৩৫-৩৭ টাকা। আবার তা থেকে ২৫ শতাংশ বাদ দেওয়া হয়। অথচ ট্যানারি মালিক ও সরকার ঢাকার বাইরের চামড়ার দর দিয়েছিল ৫৬-৬২ টাকা। সবমিলে এখন আড়তদারের কাহিল অবস্থা। সরকারি দরের এক-তৃতীয় দর পাচ্ছেন আড়তদাররা।’

প্রবীণ এ চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, ‘কোরবানির আগে সরকার পশুর চামড়া সংরক্ষণের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অথচ কোরবানের পর আর কোনো মনিটরিং করা হয় না। এরফলে প্রতিবছর ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’ ট্যানারি মালিকেরা সরকার থেকে নানা ধরনের সুবিধা পেলেও আড়তদাররা সরকার থেকে কোনো সুবিধা পান না। শুধু লোকসান গুনে গুনে ফতুর হয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে ১৫০ জন আড়তদার ছিল। পুঁজি হারিয়ে এখন ২৫-৩০ জনে নেমেছে।

আড়তদার সমিতির নেতারা বলেন, এ পর্যন্ত দুটি মাদ্রাসার প্রায় ৩৫ হাজার চামড়া বিক্রি করা হয়েছে। অথচ কোরবানির ঈদের এক সপ্তাহ পর থেকে লবণযুক্ত চামড়া বেচাকেনা শুরু হয়। এবার তাতে ভাটা পড়েছে। এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

আড়তদার সমিতির সহ-সভাপতি সম্রাট মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে চট্টগ্রামের আড়তদারদের ২০-২২ কোটি টাকার বকেয়া আটকে রয়েছে। মূলধন হারিয়ে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছেন। এবারও লবণযুক্ত চামড়া বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর চামড়া কেনায় অনীহা দেখা দিতে পারে। সরকার এ বিষয়ে বড় ধরনের পদক্ষেপ না নিলে দেশের জাতীয় সম্পদ চামড়া খাত তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।

চট্টগ্রামে চামড়ার আড়ত আতুরা ডিপোতে দেখা যায়, গুদাম ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ত্রিপল টাঙিয়ে কাঁচা চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে এসব চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন আড়তদাররা। আড়তদাররা বলেন, লবণযুক্ত চামড়া সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ রাখা যায়। এরপর চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়।

আড়তদার সমিতির সহ-সভাপতি মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন,  আতুরার ডিপো ছাড়াও অনেক ব্যবসায়ী বিভিন্ন উপজেলায় কাঁচা চামড়া লবণজাত করে সংরক্ষণ করেছেন। এখন ক্রেতার অভাবে অনেকেই বাধ্য হয়ে ঢাকার আড়তদারদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এতে ট্রাক ভাড়া ও আড়তদারির অতিরিক্ত খরচ ব্যয় করতে হচ্ছে। ঢাকার আড়তদারদের সঙ্গে ট্যানারি মালিকদের মধ্যে বেচাকেনার চুক্তি হয়। এতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা তৃতীয় পক্ষ হয়ে যায়। এতে চামড়ার টাকা পাওনা নিয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

এই খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও চামড়াশিল্পের কমপ্লায়েন্স (দূষণমুক্ত ও উন্নত কর্মপরিবেশ) অর্জন করতে না পারায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছে। অথচ চামড়া শিল্প হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানিযোগ্য খাত।

দর পাননি মৌসুমি ব্যবসায়ীরা
পাড়া-গাঁ থেকে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এবার আকার ভেদে ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় চামড়া সংগ্রহ করেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। আর অনেকেই চামড়া বিক্রি করতে না পেরে এতিমখানা ও মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে দিয়েছেন।
কোরবানির চামড়া বেচাকেনার বড় মাধ্যম হচ্ছে আতুরার ডিপো চামড়ার আড়তে। বিক্রির জন্য আড়তে এনে অনেকেই চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে খালি হাতে ফিরে যান। এতে বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হন অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী। এবার কাঁচা চামড়া কিনে লবণজাত করে শঙ্কায় পড়েছেন আড়তদাররা।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট