চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের অভিঘাত বাংলাদেশের সামনে নতুন ঝুঁকি

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ

ইরান কেন হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে এত তীব্র হামলা চালাচ্ছে? বিষয়টি বুঝতে হলে একটি সহজ প্রশ্ন করতে হবে: ইরান কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে হারাতে চায়?
উত্তর- না। ইরান জানে, প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার তুলনাই চলে না। কিন্তু ইরানের কৌশলও যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করা নয়। বরং লক্ষ্য হলো- আমেরিকাকে বোঝানো যে ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে যুদ্ধের মূল্য শুধু তেহরানকে নয়, ওয়াশিংটনকেও দিতে হবে।

 

এই কারণেই সাম্প্রতিক ইরানি হামলা নিছক প্রতিশোধ নয়; এটি একটি পরিবর্তিত প্রতিরোধ কৌশল। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ইরান যুদ্ধের সামরিক ক্ষেত্রকে অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রেও নিয়ে যেতে চাইছে। হরমুজে সাম্প্রতিক জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে বিঘ্ন সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।

 

যুদ্ধের আসল লক্ষ্য কি শুধু সামরিক?
একেবারেই নয়। ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার সামরিক শক্তি নয়, বরং দূরত্ব ও ব্যয়। আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চালাতে হলে হাজার হাজার মাইল দূরের ঘাঁটি, বিমান, জাহাজ, জ্বালানি, রসদ ও বিপুল অর্থের ওপর নির্ভর করতে হয়। ইরান সেই অবকাঠামোতেই আঘাত করতে চাইছে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ইরানের হাতে একটি ভূরাজনৈতিক অস্ত্র। এই সরু জলপথে অস্থিরতা সৃষ্টি হলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
অর্থাৎ একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হয়তো একটি মার্কিন ঘাঁটিতে সীমিত ক্ষতি করতে পারে; কিন্তু হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে তার চেয়ে বহুগুণ বড় অভিঘাত তৈরি করতে পারে।

 

এবার যুক্তরাষ্ট্রের ঘরের রাজনীতি
এখানেই ইরানের হিসাবটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই ইরান যুদ্ধকে নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এর অর্থনৈতিক মূল্য সামনে আসছে, বিশেষ করে জ্বালানির দাম।
ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া তেলের দাম সম্ভবত মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কমবে না। অর্থাৎ হোয়াইট হাউস নিজেই স্বীকার করছে যে যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত নির্বাচনের সময় পর্যন্ত থাকতে পারে।
এখানে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: আমেরিকান ভোটার যুদ্ধের ভূরাজনৈতিক সাফল্যের চেয়ে পেট্রোল পাম্পের দাম বেশি দ্রুত অনুভব করেন।
গ্যাসোলিনের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে; খাদ্য ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে; মূল্যস্ফীতি বাড়ে। তখন সাধারণ ভোটারের কাছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি অপেক্ষা নিজের পরিবারের মাসিক ব্যয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইরান তাই হয়তো হিসাব করছে- আমেরিকান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে হবে না; আমেরিকান ভোটারকে যুদ্ধ নিয়ে অস্বস্তিতে ফেলাই যথেষ্ট।

 

তেলের দামই হতে পারে যুদ্ধের মোড় ঘোরানোর হাতিয়ার
হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা তত বাড়বে। এর সঙ্গে বাব আল-মান্দাবেও যদি হুথিদের তৎপরতা বাড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ একই সঙ্গে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ইতোমধ্যে বাব আল-মান্দাব ঘিরে হুথিদের সামরিক তৎপরতা সৌদি অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক নৌপথের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এটি শুধু তেল পরিবহনের সমস্যা নয়। জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়লে বিমা খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ফলে তেলের পাশাপাশি খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং অন্যান্য আমদানি পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি হবে- উচ্চ তেলের দাম + উচ্চ মূল্যস্ফীতি + ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’।

 

বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত
বাংলাদেশ এই সংঘাত থেকে অনেক দূরে। কিন্তু অর্থনীতির দিক থেকে আমরা মোটেই দূরে নই। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভর।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের ওপর চাপ পড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও পড়বে। এর সঙ্গে রয়েছে আরেকটি বড় বিষয়- প্রবাসী আয়।
বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো থেকেই প্রায় ৪৫ শতাংশ রেমিট্যান্স এসেছে বলে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি, নির্মাণ, পরিবহন ও ব্যবসায়িক কর্মকা- ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ পড়বে। বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হলে ডলার ব্যয় বাড়বে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি, মুদ্রার ওপর চাপ এবং মূল্যস্ফীতি, সবই বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং রেমিট্যান্সের ওপর সম্ভাব্য চাপের কথা বলা হয়েছে।

 

আমাদের দুর্বলতার জায়গাটি কোথায়?
এই সংকট আমাদের পুরোনো একটি দুর্বলতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা।
দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে আন্তর্জাতিক কোনো সংঘাতই আর ‘বিদেশের যুদ্ধ’ থাকে না। হরমুজে একটি জাহাজে হামলার প্রভাব চট্টগ্রামের বাজারেও পৌঁছাতে পারেÑজ্বালানি, পরিবহন, খাদ্য ও শিল্পপণ্যের দামের মাধ্যমে।
তাই বর্তমান সংকট বাংলাদেশের জন্য কেবল তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা নয়; এটি জ্বালানি নীতি নতুন করে ভাবার সতর্কবার্তা।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি দক্ষতা এবং বহুমুখী আমদানি উৎস, এসবকে আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে রেখে দেওয়ার সুযোগ নেই।

 

শেষ পর্যন্ত কে জিতবে?
এই যুদ্ধের সামরিক ফলাফল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে কে কতদিন এই সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য বহন করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অসীম সামরিক শক্তি নেই; ইরানেরও নেই। কিন্তু ইরানের হাতে রয়েছে ভূগোল, ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক মিত্র এবং হরমুজের মতো কৌশলগত অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, বৈশ্বিক জোট ও অর্থনৈতিক শক্তি। তাই যুদ্ধটি এখন এক অদ্ভুত সমীকরণে দাঁড়িয়েছে।
ইরান আমেরিকাকে সামরিকভাবে হারাতে পারবে না; আমেরিকাও ইরানকে শুধু বোমা মেরে তার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা মুছে ফেলতে পারবে না।
ফলে শেষ পর্যন্ত সমাধান সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, আলোচনার টেবিলেই।
কিন্তু সেই আলোচনার টেবিলে কে শক্তিশালী অবস্থানে বসবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
আর বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য শিক্ষা আরও সরল: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দূরের ঘটনা নয়। তেলের বাজার, ডলার, রেমিট্যান্স ও মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে তার অভিঘাত সরাসরি আমাদের ঘরে এসে পৌঁছাতে পারে।
তাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের দিকে শুধু ভূরাজনৈতিক দর্শক হিসেবে তাকিয়ে থাকার সময় শেষ। নিজেদের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রস্তুতিও এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট