আজ বিশ্ব হাতি দিবস। হাতি সংরক্ষণ ও এর আবাসস্থল রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। একদিকে বন উজাড় ও আবাসস্থল ধ্বংস, অন্যদিকে হাতির চলাচলের করিডর দখল হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে সংকুচিত হচ্ছে বন্যহাতির বিচরণক্ষেত্র। ফলে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে হাতির পাল। এতে বাড়ছে মানুষ ও হাতির সংঘাত, ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও। বন বিভাগ ও হাতি-গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম এলাকায় একসময় ১২টি হাতির করিডর ছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি করিডর দখল, বন উজাড় এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে হাতির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে হাতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবার গ্রহণ করে। কিন্তু চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ও বন কেটে বসতি ও নানা স্থাপনা নির্মাণের ফলে খাবার সংকট বাড়ছে ও হাতির আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। খাবার ও নিরাপদ বিচরণের জায়গা হারিয়ে বন্যহাতিরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে।
হাতি-গবেষকদের মতে, পুরোনো চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যহাতির বিচরণ বেড়েছে। বিশেষ করে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী ও লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় হাতির পাল দেখা যাচ্ছে। লোকালয়ে হাতির মুখোমুখি হয়ে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
এছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য বসতি ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কক্সবাজারের হাতির আবাসস্থল ও অভয়ারণ্য এলাকার বনাঞ্চলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা পেরিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় হাতির বিচরণ বাড়ছে। সম্প্রতি আনোয়ারা-কর্ণফুলীর দেঁয়াং পাহাড়েও হাতির পাল আসতে দেখা গেছে।
বাঁশখালী জলদী বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, লোকালয়ে হাতির উপস্থিতির কারণে আতঙ্কের পাশাপাশি মানুষ ও হাতির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। আনোয়ারায় বর্তমানে আমাদের ইআরটি (ইলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম) রাতে পাহারা দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে হলে হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ, চলাচলের করিডর দখলমুক্ত রাখা এবং বন উজাড় বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে হাতি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা নির্মাণের ফলে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। মূলত মানুষই হাতির জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে। হাতি তাদের নিজেদের জায়গায় ফিরে আসছে। এ সমস্যা সমাধানে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন ও শিল্পকারখানা নির্মাণ করতে হবে, যাতে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব এড়ানো যায়।
চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বলেন, বন্যহাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের বন বিভাগের পক্ষ থেকে নির্ধারিত নিয়মে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। বন্যহাতিকে জোর করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। হাতিরা স্বাভাবিকভাবেই তাদের নিরাপদ আবাসস্থলে ফিরে যাবে। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতির চলাচলের সময় সতর্কতা অবলম্বন এবং বন্যহাতির হাত থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
পূর্বকোণ/পিআর















