১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংসলীলায় পরিণত হয়েছিল বাঁশখালী। বেসরকারি হিসাবে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল সেই প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ে। সাগর ও নদীর তীরে বাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানিতে জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর প্রেক্ষিতে এলাকাবাসীর প্রধান দাবি ছিল, বাঁশখালীকে সুরক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা। কিন্তু ৩৫ বছরেও সেই টেকসই বাঁধ নির্মাণ হয়নি বাঁশখালীতে।
আজ সরকার প্রধান তারেক রহমান বন্যাদুর্গত মানুষের কথা শুনতে বাঁশখালীতে আসছেন। বন্যা পুনর্বাসনের ঘরহারা মানুষকে ঘর উপহার দেবেন। এই এলাকার মানুষের প্রধান দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা। বেড়িবাঁধ নির্মাণ বাস্তবায়ন চাই। বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছরই উপকূলীয় এলাকার মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় বহু পরিবার বসতভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। উপকূলের চারটি ইউনিয়নের গ্রামের পর গ্রাম সাগর ও নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে বাঁশখালীর বাহারছড়া, খানখানাবাদ, ছনুয়া, সাধনপুর, পুকুরিয়া, গণ্ডামারা ও শেখেরখীল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় সাগর ও নদীভাঙনে গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়েছে। হারিয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও বসতভিটা। দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী সংস্কার ও মেরামতের মাধ্যমে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
১৯৯৬ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। তবে নির্মাণের পরপরই বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে ছনুয়া, গণ্ডামারা, বাহারছড়া, খানখানাবাদ, সাধনপুর ও পুকুরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বারবার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ২০১৫ সালে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। পরে কয়েক দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে তা ২৯৩ কোটি ৬০ লাখ এবং পরবর্তীতে প্রায় ৩১০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০২২ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাঁধের বিভিন্ন অংশ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ ও অভিযোগ রয়েছে।
ছনুয়া ইউনিয়নের চেমটখালী এলাকার বাসিন্দা শামশুল আলম ও হারুনুর রশিদ বলেন, প্রতিবছর জোয়ারের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। বাঁধ দুর্বল হওয়ায় জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। আমরা সরকারের কাছে স্থায়ী ও উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানাই।
গণ্ডামারা ইউনিয়নের খাটখালী ও আলোকদিয়া এলাকার বাসিন্দা মোক্তার আহমদ ও এমরান হোসেন বলেন, বাঁধ ভাঙনের কারণে খাটখালী বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ এবং আলোকদিয়া এলাকার বড় একটি অংশ সাগরগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে বহু পরিবার বসতভিটা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।
খানখানাবাদ ইউনিয়নের হাছিয়াপাড়া ও প্রেমাশিয়া এলাকার বাসিন্দা আবু বক্কর ও শফর উদ্দীন বলেন, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে হাছিয়াপাড়া গ্রামের বড় অংশ বিলীন হয়ে যায়। এ পর্যন্ত পাঁচ বার বসতভিটা পরিবর্তন করা হয়েছে। অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেয়। তাদের দাবি, বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত একটি উঁচু টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, ৩৬ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ, ১০৩ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ বাঁধ এবং ২৫ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সাঙ্গু নদীর তীরে রয়েছে। বর্তমানে ৭০টি স্লুইসগেট/রেগুলেটর রয়েছে। এর মধ্যে ৪৬টি সচল, ১৩টি আংশিক সচল এবং ১১টি অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
পাউবো সূত্র জানায়, ১৩৬২ কোটি ৫২ লাখ ৪০ হাজার টাকার বন্যা পুনর্বাসন পরবর্তী প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের ২৭ মে আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলায় ভাঙন প্রতিরোধে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৮৭৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
বাঁশখালী উপজেলার জলকদর খাল খননসহ পোল্ডার-৬৪-এর টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প শীর্ষক একটি পুনর্বাসন প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়। প্রস্তাবনায় ঈশ্বরবাবুর হাট থেকে সরল ব্রিজের ভাটি পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার জলকদর খাল পুনঃখনন, ছনুয়া খাল ও গোবিন্দ খালসহ ৭০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার শাখা খাল খনন, ১১টি অকার্যকর স্লুইসগেট পুনর্নির্মাণ, ১৪টি স্লুইসগেট প্রতিস্থাপন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে পাঁচটি ইনলেট-আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
পুকুরিয়া, সাধনপুর ও খানখানাবাদ ইউনিয়নে ৩ দশমিক ৮৫০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, গণ্ডামারা, বাহারছড়া ও ছনুয়া ইউনিয়নে ৫ দশমিক ৯৭৫ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধের ঢাল প্রতিরক্ষা এবং বাহারছড়া, কাথারিয়া, সরল, চাম্বল ও গণ্ডামারা ইউনিয়নে ৭৬ দশমিক ০৮৯ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ বাঁধ মেরামতের প্রস্তাব রয়েছে।
পাউবো উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, বর্তমানে বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় ৫শ কোটি টাকার প্রকল্প কাজ চলমান আছে।
পূর্বকোণ/আদর















