‘দুর্ঘটনার আগের দিন রাতে স্বামী আমাকে বলেছিল, বিয়েবার্ষিকীতে ঘুরতে নিয়ে যাবে। উপহার দেবে। কিন্তু সেই দিনটিতেই সে আমাকে মৃত্যু উপহার দেবে, তা ভাবিনি।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার থেমে যান বিবি ফাতেমা নাইমা। গলা শুকিয়ে আসে। চোখের কোণে জমে ওঠে জল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলতে শুরু করেন। যেন প্রতিটি শব্দের সঙ্গে বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে নতুন করে হাহাকার।
১৯ জুলাই ছিল নুরনবী হৃদয় ও নাইমার বিবাহবার্ষিকী। দিনটি ঘিরে ছিল কত পরিকল্পনা, ছোট ছোট স্বপ্ন। স্বামী-স্ত্রী মিলে একটু ঘুরবেন, সন্তানকে নিয়ে সময় কাটাবেন-হয়তো উপহারও ছিল কোনো একান্ত চমক। কিন্তু সেই দিনটিই হয়ে গেল জীবনের সবচেয়ে বিষণ্ন দিন। যেদিন ভালোবাসার স্মৃতি উদ্যাপন করার কথা ছিল, সেদিনই স্বজনদের কাঁদিয়ে হৃদয় পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর একটি লবণ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া পাঁচজনের একজন ছিলেন তরুণ হৃদয়। বিবাহবার্ষিকীর দিনটিতে স্বামী এভাবে আকাশের তারা হয়ে যাবেন-এখনো যেন মেনে নিতে পারেন না নাইমা। বলেন, ‘ও চলে যাওয়ার পর থেকে আমার এক একটা দিন একটা বছরের মতো লাগে। যেদিন আমাকে আর বাচ্চাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল, সেদিন কিনা সে একাই চলে গেল। আর পাঁচটা দিনের মতো দুমদাম পা ফেলে নয়-স্বজনদের কাঁধে চড়ে।’
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিয়ে হয়েছিল হৃদয়-নাইমার। ১৬ মাস আগে তাদের সংসারে আসে একমাত্র সন্তান হোসাইন নুর রিহান। সংসারে আয়-ব্যয়ের টানাপোড়েন ছিল। তবে অভাব ছিল না ভালোবাসার। কিন্তু ‘হৃদয়হীন’ সেই সংসারে আজ শুধুই দুঃখের আনাগোনা।
১৬ জুলাই সকাল ৯টায় অফিসে যাওয়ার আগে ঘুমন্ত ছেলেকে তুলে কোলে টেনে নেন হৃদয়। বুকের কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বলেছিলেন, ‘বাবাকে চুমু দাও।’ ছোট্ট রিহানও পরম মমতায় বাবার গালে এঁকে দিয়েছিল একটি চুমু। কে জানত, সেটিই হবে শেষ চুমু!
অফিসের উদ্দেশে বের হওয়ার সময় স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘আজ তাড়াতাড়ি ফিরব। বন্ধুর বিয়েতে যেতে হবে।’ হয়তো নাইমাও ভেবেছিলেন, সন্ধ্যার আগেই দরজায় কড়া নাড়বে অতিপরিচিত সেই মানুষটি।
কিন্তু সকাল ১০টার দিকে খবর আসে-লবণ কারখানায় বিস্ফোরণ হয়েছে। গুরুতর আহত হৃদয়কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। খবর পেয়েই হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন স্বজনেরা। তখন অপারেশন কক্ষের শীতল ঘরে অন্য চারজনের সঙ্গে দগ্ধ হৃদয়ের পুড়ে যাওয়া শরীর জ্বলছিল। বাইরে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিলেন স্বজনেরা। ভেতরে চলছিল জীবন-মৃত্যুর লড়াই।
কিছুক্ষণ পর হৃদয়কে দেখার অনুমতি মেলে। স্বামীর সেই অসহায় মুহূর্ত এখনো চোখে ভাসে নাইমার। আর মনে পড়ে হৃদয়ের সেই কথাগুলো, ‘আমাকে মাফ করে দিও। ছেলের প্রতি খেয়াল রেখো। তাকে হেফজখানায় ভর্তি করিও।’
চোখ ঝলসে যাওয়ায় দেখতে পাচ্ছিলেন না হৃদয়। তবু স্বজনদের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন, ছেলেটাকে যেন একবার তার বুকের ওপর রাখা হয়। কিন্তু শরীরজুড়ে আগুনের ক্ষত থাকায় সেটিও সম্ভব হয়নি। হয়তো তখনই বুঝে গিয়েছিলেন হৃদয়- সময় ফুরিয়ে আসছে। মৃত্যুর সেই আগমনী বার্তা যেন টের পেয়েই সবার কাছে মাফ চেয়ে নেন তিনি। এরপর হৃদয়কে নেওয়া হয় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে। তারপর সেই ১৯ জুলাই-যে দিনটি হওয়ার কথা ছিল তাদের ভালোবাসার দিন, সেই দিনই মৃত্যুর কাছে শেষ হয়ে যায় হৃদয়ের যন্ত্রণা।
রিহানের বয়স এখনো এতটা হয়নি যে মৃত্যু কী, তা বুঝবে। কিন্তু বাবার আদর যে কী, তা সে বুঝত। বাবার কোল, বাবার স্পর্শ, বাবার কণ্ঠ-এসবই ছিল তার ছোট্ট পৃথিবীর নিরাপদ আশ্রয়। আজ সেই পৃথিবীতে বাবা নেই। প্রায় ২০ দিন ধরে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত শিশুটি বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। কেউ বাবার নাম ধরে ডাকলে রিহান ফিরে তাকায় তার দিকে। ছোট্ট চোখ দুটোতে যেন একটাই চাওয়া-‘আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও।’ কিন্তু সেটি যে আর কখনো হবে না।
দুর্ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগে ওই কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন হৃদয়। জীবিকার প্রয়োজনে নতুন কর্মস্থলে পা রেখেছিলেন। কিন্তু সেখানে বেশিদিন কাজ করা হলো না। আগুন শুধু হৃদয়ের শরীর পুড়িয়ে দেয়নি; পুড়িয়ে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্নও।
স্বামীকে হারিয়ে এখন নাইমার সামনে এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। একদিকে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর অসহনীয় শোক, অন্যদিকে ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কঠিন বাস্তবতা। কীভাবে পাড়ি দেবেন জীবন নামের এই দীর্ঘ মহাসমুদ্র? উত্তর নেই অল্পবয়সেই বিধবার খাতায় নাম লেখা এই গৃহবধূর।
পূর্বকোণ/রেহেনুমা /পারভেজ















