চট্টগ্রাম শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

মুক্ত হয়নি সন্ত্রাস ও ভূমিদস্যুতা

পরিবর্তন নেই জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড

২০ জুন, ২০২৬ | ১২:০৬ অপরাহ্ণ

দেশের ভেতর আরেক দেশ, সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য, ভূমিদস্যুতা ও মাদকের স্বর্গরাজ্য- এরকম নানান নামে কুখ্যাত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার পাহাড়ি জনপদ জঙ্গলসলিমপুর ও আলীনগর।

 

 

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের একেবারে নাকের ডগায় গড়ে উঠা এই জনপদে ৩১০০ একর সরকারি খাস জমির দখল, পাহাড়ে অবাধে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার নিয়ন্ত্রণসহ নানান কারণে কিছুদিন পরপর খুন, ধর্ষণ, অপহরণসহ নানান ঘটনায় বিব্রত প্রশাসন সন্ত্রাসীদের শিক্ষা দিতে এখানে বেশ কয়েকবার বড় অভিযান পরিচালনা করলেও কিছুতেই তাদেরকে থামানো যাচ্ছে না। বরং সন্ত্রাস ও ভূমিদস্যুতা নির্মুল করতে গিয়ে খুন হয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তা, হামলার শিকার হয়েছেন জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ, সাংবাদিকসহ আরো অনেকে।

 

জানা যায়, সীতাকুণ্ড উপজেলার সর্ব দক্ষিণে ১০নং সলিমপুর ইউনিয়নে দুর্গম পাহাড়ের পাশাপাশি দুটি স্থানের নাম জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর। ভৌগলিকভাবে চট্টগ্রাম মহানগর ও হাটহাজারী উপজেলা এর দুই দিকে অবস্থান করে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, একসময় এই এলাকাটি ছিলো অত্যন্ত দুর্গম। এখানে রয়েছে ৩১০০ একরেরও বেশি সরকারি খাস পাহাড়ি জমি। ৯০ এর দশকে চিহ্নিত ভূমিদস্যু আলী আক্কাসের কুনজর পড়ে এখানে। তিনি পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করে দখল স্বত্ব বিক্রি শুরু করেন চট্টগ্রামে বসবাসকারী ছিন্নমূল মানুষদের মাঝে। নামমাত্র মূল্যে জায়গা পেয়ে সেখানে নানান শ্রেণির মানুষের বসবাস বাড়তে থাকে। এভাবে মাত্র এক দশকেই সেখানে অর্ধলক্ষ

মানুষের বসবাস শুরু হলে তাদের পানি-বিদ্যুতের ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নানান স্থাপনা নির্মাণের নামে নিয়মিত চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা শুরু করে আক্কাস বাহিনী কোটি কোটি টাকার মালিক হয়।

 

তবে বিগত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে র‌্যাবের ক্রস ফায়ারে প্রাণ হারান আক্কাস। এরপর তার কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে পড়ে ১১টি দলে বিভক্ত হয়ে যায় তার দলের সন্ত্রাসীরা। থেমে থেমে চলতে থাকে খুন, বন্ধুক যুদ্ধ, অপহরণ, ধর্ষণের মতো ঘটনা। এসময় কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, গ্রেপ্তার করলে এক পর্যায়ে কিছুটা থামে তারা। এরপর এখানে প্রবল প্রতাপশালী হয়ে ওঠে মো. ইয়াছিন।

 

এরই মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ফৌজদারহাট -বায়েজিদ লিংক রোড তৈরি হয়ে গেলে জঙ্গল সলিমপুর মাত্র কয়েক মিনিটে চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রবেশ করা সম্ভব হয়। এতে এখানে জায়গার দাম বেড়ে আরো বেশি বসতি স্থাপন হতে থাকে। শেষ এক দশকে এখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে লক্ষাধিক হয়ে যায়। প্রশাসনকে ঠেকিয়ে তাদের দখলস্বত্ব বজায় রাখতে তাদেরকে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে আন্দোলনও শুরু করে অবৈধ দখলদাররা। ২০২২ সালে একদিন ঐ এলাকা পরিদর্শনে যান ইউএনওসহ এলাকার জনপ্রতিনিধিরা। অবৈধ দখলকারীরা সেসময় প্রশাসনের গাড়ি বহরে হামলা চালিয়ে এক ইউপি সদস্যকে মারধর করে।

এতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ, আনসারের সমন্বয়ে যৌথবাহিনী গঠন করে খাস জমি উদ্ধারে অভিযান শুরু করলে অবৈধ দখলকারীরা তাতেও বাধা দিতে থাকে। তারা মহাসড়ক অবরোধ, জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর ইটবৃষ্টিসহ নানা উপায়ে আক্রমণ করতে থাকে। এসব ঘটনায় বারবার ইয়াছিনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু অপতৎপরতা বন্ধ হয়নি। ফলে প্রশাসন এখানে র‌্যাব ক্যাম্প, পুলিশের চৌকি স্থাপন, জেলখানা স্থানান্তরসহ নানান স্থাপনা করার উদ্যোগ এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করলে ভূমিদস্যুরা নানান উপায়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করে।

২০২৪ সালে সরকারের পতন হলে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থমকে যায়। কিন্তু এ সময় থেকে সেখানে কর্মকাণ্ড শুরু করে বিএনপি নেতা রোকন উদ্দিন। তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ প্রভাব বিস্তার শুরু করলে ইয়াছিনের সাথে শুরু হয় আধিপত্যের লড়াই। দু’পক্ষে সংঘর্ষ, গোলাগুলির মতো ঘটনাও ঘটে। সেসব ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে গেলে ইয়াছিন বাহিনীর হাতে হামলার শিকার হন এখন টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক, ভাঙচুর হয় ক্যামেরা। এ সময় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারে তৎপর হয়ে নামে র‌্যাব। কিন্তু গত মার্চ মাসে এরকম একটি অভিযান পরিচালনা করার সময় ইয়াছিন বাহিনী হামলা চালিয়ে এক র‌্যাব কর্মকর্তাকে হত্যা করে। এতে ইয়াছিনের দলবলের বিরুদ্ধে মামলা হলে ইয়াছিন প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে বলে এখানে অভিযান চালাতে হলে কাকে গ্রেপ্তার করবে জানিয়ে আসতে হবে।

এভাবে বারবার সেখানে গিয়ে উল্টো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিপদে পড়ায় প্রশাসন তৎপর হয়ে সেখানে র‌্যাব ক্যাম্প স্থাপনের কাজ শুরু করে। কিন্তু কাজ চলাকালীন গত ২৪ মে রাতে ভূমিদস্যু সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে র‌্যাব ক্যাম্পে গুলি চালাতে শুরু করে এবং ক্যাম্পের সীমানা দেয়াল বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, এসব ঘটনার পর যেন কোন অভিযান চালাতে না পারে সে জন্য পাহাড়ি পথের একাধিক স্থানে বড় বড় গর্ত করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে সাতজন র‌্যাব সদস্যকে একটি ঘরে তারা ঘিরে ফেললে পরে তাদের উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনার পর সেখানে অভিযান চালান র‌্যাব-৭ চট্টগ্রাম এর লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, র‌্যাব ক্যাম্পে ইয়াছিন বাহিনী গুলি ছুঁড়লে আত্মরক্ষার্থে র‌্যাবও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। সে ঘটনায় মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তারও হয়েছে। এর আগে ৯ মার্চও সেখানে যৌথবাহিনী কয়েক হাজার ফোর্স নিয়ে অভিযান চালায়। এদিকে সন্ত্রাসীদের হামলা, প্রশাসনের পাল্টা এ্যকশন নিয়মিত চললেও থামেনি সন্ত্রাস।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে সেখানে অভিযানের খবর ভেতর থেকেই আগেই ফাঁস হয়ে যায়। ফলে অভিযানে তেমন কোন সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হচ্ছে না।

এরই মধ্যে গত ৮ জুন থেকে জঙ্গল সলিমপুরে সেনাবাহিনী সংযুক্ত করে তাদের মাধ্যমে চারটি সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন  সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ (পিএসসি, ইঞ্জিঃ অধিনায়ক ২৬ এসিবি)। তিনি বলেন, সরকার এলাকাটিকে সন্ত্রাসমুক্ত উন্নত জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এ লক্ষে এখানে সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তারা পাহাড়ে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতায় এখানে কাজ করতে চান।

এদিকে কাজ চলমান থাকলেও ইতিমধ্যে এসব রাস্তা জনস্বার্থে নয়, বরং এগুলোর পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য আছে বলে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করছে ঐ ভূমিদস্যু চক্র। এভাবে সরকারের প্রতিটি কাজ ঠেকাতে উঠে পড়ে লাগে চক্রটি।

সীতাকুণ্ডের ইউএনও মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ দখল, সন্ত্রাস দমনে জেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যহত রয়েছে। সন্ত্রাসীরা যত কিছুই করুক এসব অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী সকলে ঐ এলাকায় নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে বলে জানান জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে কারো বৈধ দলিল থাকলে তিনি বসবাস করবেন কিন্তু অবৈধ দখলদাররা সরকারি জায়গা ছাড়তে হবে।

পূর্বকোণ/পিবিরা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট