চট্টগ্রামের আনোয়ারা সমুদ্র সৈকত সুরক্ষায় ৫৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পাউবোর ভাষ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে সমুদ্র সৈকতকে আরও আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন করার পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে আনোয়ারা পারকি সৈকত। এটা মূলত কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। অর্থাৎ সাগর আর কর্ণফুলী নদীর অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে ঐ সৈকতে। মোহনার পশ্চিম তীরে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। কক্সবাজার ও নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের পর ভ্রমণপ্রেমীদের মন কাড়ে পারকি সৈকত। এ সৈকত ভূমি প্রায় ১৩ কিলোমিটার বিস্তৃত। সাগরের ফেনিল জলরাশি ও বিস্তৃত ঝাউবাগান প্রকৃতিপ্রেমীদের নজর কাড়ে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, ‘বন্যা-ঘূর্ণিঝড় থেকে রায়পুর ইউনিয়ন সুরক্ষা, উপকূলীয় বাঁধ প্রতিরক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও পারকি সমুদ্র সৈকতকে আরও দৃষ্টিনন্দন করার লক্ষ্যে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এরফলে সমুদ্র সৈকত ছাড়াও উপকূলীয় এলাকা সুরক্ষা ও সবুজ বেষ্টনীতে পরিণত করা হবে। প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, সেচ সুবিধা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে সাপমারা খাল খনন করা হবে। যাতে মাছধরার ট্রলার চলাচল করতে পারে। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের ডিপিপি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডে পর্যালোচনা করা হয়েছে। কিছু সংযোজন-বিয়োজনের পর মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হবে।’
প্রকল্পে কী থাকছে : পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তাবিত প্রকল্পে দেখা যায়, তিন দশমিক ৪৬০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ নির্মাণ, দুই দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, একটি স্লুইস গেট নির্মাণ, দুই দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ, এক দশমিক ৬০০ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এ প্রকল্পের জন্য ৩০ দশমিক ৩৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পারকি সমুদ্র সৈকতকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। রাতযাপনের ব্যবস্থাও আছে। ছোট-বড় অনেক রেস্টুরেন্ট আছে সমুদ্রসৈকত লাগোয়া। সেখানে আছে সামুদ্রিক মাছসহ নানা ধরনের খাবারের সুব্যবস্থা। রাতে বারবিকিউ করার ব্যবস্থাও আছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খ ম জুলফিকার তারেক বলেন, পারকি সৈকত হচ্ছে দেশের সম্ভাবনাময় একটি সমুদ্র সৈকত। কিন্তু সাগরের উত্তাল ঢেউ ও অব্যাহত ভাঙনে সৈকতের সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সৈকতের স্থায়িত্ব ও টেকসই হুমকির মুখে পড়েছে। বর্ষাকালে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। সবকিছু বিবেচনা করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রেখে সৈকতের উন্নয়ন ও দৃষ্টিনন্দন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা আনোয়ারা ও পারকি সমুদ্র সৈকতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গত ৫-৬ বছরে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। বাঁধ, বসতবাড়ি, সড়ক, বাজার ও কৃষিতে বড় ক্ষতি হয়েছে। কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনখাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য উপকূল রক্ষায় টেকসই উন্নয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, পারকি সৈকত এলাকায় দুই দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার এলাকা অরক্ষিত থাকায় নৌবাহিনীর সিকিউরিটি সাপোর্ট, কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়া ও পর্যটন কমপ্লেক্স ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভাঙনরোধে ৩৫১ কোটি টাকার প্রকল্প : ২০২৪ সালের ২৭ মে আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলায় ভাঙন প্রতিরোধে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৮৭৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এরমধ্যে আনোয়ারার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৩৫১ কোটি টাকা। সাগর ও সাঙ্গু তীরে ৫ দশমিক ১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। এরমধ্যে হাইলধর ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নে দুই দশমিক ৪০ কিলোমিটার এবং গহিরা থেকে পারকি পর্যন্ত অংশে দুই দশমিক ৭৮ কিলোমিটার টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন : পারকি সমুদ্র সৈকতকে আধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্সে পরিণত করার লক্ষ্যে ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে পর্যটন করপোরেশন। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। ১৩ দশমিক ৩৬ একর জমিতে দর্শানার্থীদের জন্য ১৭টি স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এরমধ্যে ১৪টি কটেজ, ৪টি ডবল ডুপ্লেক্স কটেজ এবং ১০টি সিঙ্গেল কটেজ। চারতলা বিশিষ্ট একটি মাল্টিপারপাস ভবন। এছাড়াও থাকবে একটি লেক, ঝুলন্ত ব্রিজ, দুইটি পিকনিক শেড, কুকিং শেড, খেলার মাঠ। থাকবে দুইটি দোকান, একটি রেস্টুরেন্ট, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় থাকবে দুইটি বার, একটি ২৫০ আসনের কনভেনশন হল। ২০২০ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও শেষ হয়নি।
পর্যটন করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মাজেদুর রহমান বলেন, জুন মাসেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
পূর্বকোণ/রাকিব
















