চট্টগ্রাম রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

সংবাদ ভাষ্য

চিকিৎসককে সংস্কারের অংশীদার করতে হবে

কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা?

প্রফেসর ডা. খন্দকার এ কে আজাদ

২৩ আগস্ট, ২০২৬ | ৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে উঠে আসা কয়েকটি ঘটনা যেন একটি গভীর অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। কোথাও চিকিৎসকের ওপর সরাসরি হামলা, কোথাও নিরাপত্তাহীনতার প্রতিবাদে কর্মবিরতি, কোথাও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আবার কোথাও হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে রোগীর মৃত্যু-এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু বক্তব্য ও পদক্ষেপ সামনে আসছে, যা চিকিৎসক সমাজের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। কিছু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা সাময়িকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু জনপ্রিয়তা আর প্রকৃত সংস্কার এক জিনিস নয়-এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে তাই একটি সরল প্রশ্ন থেকে যায়: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে তিনি কোথায় দেখতে চান এবং তার পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য (মেজারেবল টার্গেট) কী? “স্বাস্থ্যসেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দেব”-এর মতো বক্তব্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সঙ্গে কীভাবে, কত সময়ে ও কোন আউটকামের মাধ্যমে-এই প্রশ্নের উত্তর থাকে। প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব ও বরাদ্দ দিয়েছেন- এখন মূল প্রশ্ন, বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা দিয়ে জনগণ কি সেই বরাদ্দের কাক্সিক্ষত সুফল পাবেন?

 

সমস্যাটি আসলে কোথায় : চিকিৎসক সমাজ নিজেদের ত্রুটিমুক্ত দাবি করে না। অবহেলা বা অনৈতিকতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সংকট মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, এটি সিস্টেমিক।

 

১. জনবল ও অবকাঠামোগত ঘাটতি: জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক-নার্সের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনেক নিচে, বিশেষত উপজেলা পর্যায়ে, ফলে মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া কার্যত দুরূহ।
২. দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা: প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো আস্থা অর্জন করতে না পারায় সব রোগীর চাপ পড়ে টারশিয়ারি হাসপাতালে, যা জরুরি বিভাগে বিশৃঙ্খলার বড় উৎস।
৩. ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা: পেশাদার হাসপাতাল-ব্যবস্থাপকের ঘাটতি একটি বড় শূন্যতা। হাসপাতালের দৈনন্দিন বিষয় যখন ছড়িয়ে পড়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত, তা স্পষ্ট করে দেয় মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা কতটা দুর্বল।
৪. আর্থিক জবাবদিহির ঘাটতি: স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিকল্পনার দুর্বলতা বা বাস্তবায়ন-বিলম্বে যথাসময়ে ব্যয় হয় না বা ফেরত যায়। এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ও মান কতটা বৃদ্ধি করা যেত- সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
৫. সম্পদের অপব্যবহার: কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনার পরও জনবল বা মেরামত না করায় তা অচল পড়ে থাকার অভিযোগ পুরনো। এই ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ জরুরি।
৬. প্রশিক্ষণে প্রতিবন্ধকতা: মেধাবী চিকিৎসকরা নিজ অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে চাইলেও প্রশাসনিক জটিলতায় বাধাগ্রস্ত হন। কিছু চিকিৎসকের অপব্যবহারের কারণে প্রকৃত প্রশিক্ষণার্থীদের পথ কঠিন করা দেশেরই ক্ষতি।
৭. পেশাদারিত্ব ও যোগাযোগগত দুর্বলতা: কাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি এটাও স্বীকার করতে হবে যে, চিকিৎসকদের আরও পেশাদার আচরণ প্রয়োজন, আর নার্স ও অন্যান্য সেবাদানকারীদের হতে হবে আরও মানবিক ও যোগাযোগমুখী- যা রোগী-সেবাকারীদের আস্থার সম্পর্ককে বেশি প্রভাবিত করে।

 

বারবার এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হচ্ছে? এর অন্যতম কারণ হলো- স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যবস্থাপনাগত ও কাঠামোগত ব্যর্থতার দায় অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, যদিও নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা ও ক্রয়ব্যবস্থার ব্যর্থতা একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত দায় হতে পারে নয়। তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ জনমনে সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা ধীরে ধীরে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানিয়ে দেয়। এর সঙ্গে নেতৃত্বের ভূমিকাটিও গুরুত্বপূর্ণ। একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কাঠামোগত সংস্কারে নেতৃত্ব দেওয়া। দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার ছোটখাটো বিষয়ে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা মূল কৌশলগত সংস্কার থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে। মাইক্রোম্যানেজমেন্ট নয়, দূরদর্শী নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাই জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে পারে। অন্যদিকে উদ্বেগজনক হলো, চিকিৎসক ও অন্যান্য সেবাদানকারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যকার আস্থার অবক্ষয়। একদিকে সহানুভূতিশীল আচরণ ও শ্রদ্ধাপূর্ণ যোগাযোগ যেমন রোগী-চিকিৎসক আস্থার সম্পর্ক নির্ধারণ করে, অন্যদিকে ভয় বা জনরোষের পরিবেশে একজন চিকিৎসক নিরাপদে চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না; যার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় রোগীকেই।

 

সম্ভাব্য সমাধানের বাস্তবসম্মত রূপরেখা :

১. স্পষ্ট পরিকল্পনা: পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্যখাতের রূপরেখা প্রকাশ। যেখানে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষসহ বছরে অন্তত একবার অগ্রগতি প্রতিবেদনের নিয়ম/ বাধ্যবাধকতা রাখতে হবে।
২. আর্থিক স্বচ্ছতা : বরাদ্দ-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশে একটি পাবলিক ড্যাশবোর্ড এবং সংসদীয় কমিটির কাছে জবাবদিহি করা একটি স্বতন্ত্র নিরীক্ষা সেল প্রতিষ্ঠা করা।
৩. ক্রয়ে শর্তারোপ: যন্ত্র কেনার আগে জনবল, মেরামত ও প্রকৃত চাহিদা যাচাই বাধ্যতামূলক এবং ব্যবহারযোগ্যতা বার্ষিক অডিটে অন্তর্ভুক্তিকরণ।
৪. প্রশিক্ষণ সহজীকরণ: প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই সাপেক্ষে বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের আবেদন দ্রুত অনুমোদন এবং দেশের স্বার্থে প্রয়োজনে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ প্রদান।
৫. নিরাপত্তা ও সেবার সমন্বয়: হাসপাতালে ন্যূনতম নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং কর্মবিরতিতেও জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক সংগঠনের সঙ্গে আগে থেকে চূড়ান্ত ‘মিনিমাম সার্ভিস লেভেল প্রটোকল’র ব্যবস্থা রাখা।
৬. অংশগ্রহণমূলক সংস্কার: একটি স্থায়ী স্বাস্থ্য সংস্কার এডভাইজরি কাউন্সিল গঠন করা যেখানে চিকিৎসক, প্রশাসক ও রোগী-প্রতিনিধিরা নিয়মিত সংস্কার পর্যালোচনা করবেন।
সবশেষে বলতে চাই- স্বাস্থ্যব্যবস্থা চমকপ্রদ বক্তব্য বা তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক পদক্ষেপে বদলায় না; বদলায় পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা ও জবাবদিহির মাধ্যমে।

 

তাই এখন জানতে হবে- আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে, বরাদ্দকৃত অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং এই যাত্রার জন্য কে জবাবদিহি করবেন।

 

সরকারের প্রতি আবেদন- কঠোর হোন দুর্নীতি, অপচয়, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে; চিকিৎসক সমাজের বিরুদ্ধে নয়। চিকিৎসককে প্রতিপক্ষ নয়, স্বাস্থ্য সংস্কারের অংশীদার করুন। কারণ এই সংস্কার কোনো একক সিদ্ধান্ত বা ব্যক্তির উদ্যোগে সম্ভব নয়; প্রয়োজন নতুন করে একটি সামগ্রিক সিস্টেম সাজানো, যেখানে চিকিৎসক, প্রশাসন, নীতিনির্ধারক ও জনগণ- সবাই অংশীদার হবেন।

 

লেখক: চেয়ারম্যান, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট