চট্টগ্রাম রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

অভিমত

বিদেশে নয়, দেশেই বিশ্বমানের চিকিৎসা

প্রয়োজন জাতীয় কর্মপরিকল্পনার

ডা. খন্দকার এ কে আজাদ

১৯ জুলাই, ২০২৬ | ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর চিকিৎসার জন্য প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে ব্যয় হয়- এই পরিসংখ্যান এখন স্বাস্থ্যখাতের প্রায় প্রতিটি আলোচনার কেন্দ্রে। সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সভা- সবখানেই এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে-আমরা কি সত্যিই এই বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছি, নাকি অজান্তেই বিদেশে চিকিৎসা নির্ভরতার একটি ব্যবসায়িক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছি?

 

মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র যদি কোনো বিশেষ চিকিৎসা দেশে নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে রোগী অবশ্যই বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবেন। কিন্তু এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- আমাদের রোগীরা কি সত্যিই উপযুক্ত হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছেন?

 

বর্তমানে বিদেশে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন এজেন্সি ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে রোগী পাঠাচ্ছে। আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, বিশেষ প্যাকেজ এবং নানান সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা রোগীদের প্রভাবিত করছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলো যে হাসপাতালগুলোতে রোগী পাঠাচ্ছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের কিনা, সেখানে প্রমাণভিত্তিক (Evidence-based) চিকিৎসা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, অথবা রোগীরা প্রত্যাশিত মানের সেবা পাচ্ছেন কি না- এসব বিষয়ে কোনো কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা কি রয়েছে? এশিয়ার বেশ কয়েকটি হাসপাতাল আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা প্রদান করছে এবং আমাদের দেশের যেসব রোগীর সেই ব্যয় বহনের সামর্থ্য রয়েছে, তাঁদের অনেকেই সেখানে চিকিৎসা নিয়ে উপকৃত হচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ের কিছু হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে আসা রোগীদের মধ্যে কারও কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসাজনিত জটিলতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক গাইডলাইনভিত্তিক (Guideline based) চিকিৎসা অনুসরণ করা হয়নি বলেও চিকিৎসকদের কাছে প্রতীয়মান হয়।

 

সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি পরিবর্তনও লক্ষণীয়। সাম্প্রতিক বছরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ভারতমুখী রোগীর একটি অংশ এখন চীনের দিকে ঝুঁকছেন। এখানেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য- রোগীরা কি সঠিক ক্যান্সার সেন্টার বা বিশেষায়িত হাসপাতালে যাচ্ছেন, নাকি কেবল বাণিজ্যিক প্রচারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? নতুন বন্ধু রাষ্ট্র চীনের সঙ্গে চিকিৎসা খাতে সহযোগিতার কৌশলগত দিকগুলো শুরু থেকেই সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এই সহযোগিতা যেন কেবল বিদেশের কোনো হাসপাতালের বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দেয়; বরং রোগীবান্ধব সেবার পরিবেশ গড়ে তোলা, চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর এবং তাদের সহযোগিতায় বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করে। অন্যথায় এই সহযোগিতার ফল হবে শুধু রোগীর গন্তব্য পরিবর্তন; কিন্তু দেশের ভেতরে জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তিভিত্তিক একটি টেকসই Centre of Excellence গড়ে তোলার সুযোগ হাতছাড়া হবে।

 

বাংলাদেশে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ, সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ এবং রোগীবান্ধব সেবার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের অনেক শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল চিকিৎসার মানের পাশাপাশি এই মানবিক দিকগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ায় রোগী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে আস্থা ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের দেশেও এমন রোগীকেন্দ্রিক সেবার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি বড় শিক্ষা তুলে ধরে; বিদেশে চিকিৎসানির্ভরতা কমিয়ে দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককের মতো চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসার ব্যয় এখন এতটাই বেড়েছে যে দক্ষিণ এশিয়ার বহু পরিবারের জন্য তা বহন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সুযোগও তৈরি করেছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় যদি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, রোগীকেন্দ্রিক একটি Centre of Excellence গড়ে তোলা যায়, তবে একদিকে দেশের মানুষ বিশ্বমানের চিকিৎসা নিজ দেশেই পাবেন, অন্যদিকে ভবিষ্যতে বিদেশি রোগী আকর্ষণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে।

 

একটি প্রকৃত Centre of Excellence শুধু একটি আধুনিক ভবন বা উন্নত যন্ত্রপাতি দিয়ে গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, সুশাসন, মাননিয়ন্ত্রণ, বহুবিষয়ক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবার সংস্কৃতি। এই সক্ষমতা একদিনে বা কয়েক মাসে তৈরি হয় না; এটি একটি ধারাবাহিক বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল।

 

একইভাবে, আমাদের চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, ফেলোশিপ, সম্মেলন ও একাডেমিক সহযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়াতে হবে। বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জ্ঞান ও দক্ষতার আদান-প্রদান ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বিদেশে প্রশিক্ষণকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

 

আজ দুটি বিষয়কে একই সূত্রে গাঁথা প্রয়োজন- বিদেশে চিকিৎসার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং দেশে বিশ্বমানের Centre of Excellence গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা। যদি আমরা রোগীকেন্দ্রিক, প্রমাণভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারি, তাহলে একদিকে যেমন মানুষের আস্থা বাড়বে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

 

এখন সময় এসেছে সরকার, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, করপোরেট খাত, প্রবাসী বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের একসঙ্গে বসে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার। লক্ষ্য হওয়া উচিত- বাংলাদেশের মানুষ যেন বিশ্বমানের চিকিৎসা পেতে বাধ্য হয়ে বিদেশে না যায়; বরং বিশ্বের মানসম্পন্ন চিকিৎসা যেন বাংলাদেশের মানুষের কাছেই পৌঁছে যায়।

 

বিদেশে চিকিৎসার পেছনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় রোগীকে বিদেশে যেতে নিরুৎসাহিত করা নয়; বরং দেশে এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ আস্থা নিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন। সেটিই হবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

 

লেখক: প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জারি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট