২০০৭ সালের ১১ জুন নগরের লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধসে মারা গিয়েছিলেন ১২৭ জন। একই দিন নগরের আরও আট স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছিল। সেই বিভীষিকাময় দিনটি আজও ভুলেনি চট্টগ্রামবাসী।
সেই পাহাড়ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করেছিল তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে পাহাড়ধস ঠেকাতে ৩৬টি সুপারিশমালা প্রদান করেছিল বিশেষজ্ঞ কমিটি। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হল ১৯ বছরে একটি সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ এ ঘটনার পর গঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি এই পর্যন্ত অন্তত ৩২টি সভা করেছে।
পরিবেশবিদদের অভিযোগ, শুধু বর্ষাকাল আসলে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি জেগে ওঠে। দু-একটি সভা করে। এসব সভায় পাহাড় সুরক্ষায় নানা সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিটি সভায় পাহাড় পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ এবং পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কঠোর সিদ্ধান্ত হয়। অনেক তোড়জোড় দেখা যায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।
পাহাড় কেটে তার পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বসতঘর। বর্ষাকালে পাহাড়ধসের শঙ্কা থাকলেও থামছে না বসতি গড়ার এই প্রবণতা। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ● পূর্বকোণ
অপর দিকে, সারা বছর ধরে চলে পাহাড় কাটা, পাহাড় দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ। সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর সেবা পেতে যেখানে সাধারণ মানুষের গলদঘর্ম অবস্থা সেখানে পাহাড়ে চলে অবৈধ রমরমা বাণিজ্য। যেন সরকারি মাল, দরিয়ায় ঢাল অবস্থা।
বর্ষা আসলে প্রশাসনের তোড়জোড় ও পাহাড় থেকে বসতিদের সরিয়ে আনাকে জনগণের সঙ্গে ধোকাবাজি ও প্রতারণার শামিল বললেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী। তিনি বলেন, ২০০৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে পাহাড় কাটা, ধস, স্থাপনা নির্মাণ, পাহাড় বিপর্যয় চলে আসলেও প্রশাসন একেবারেই নির্লিপ্ত। রাজনীতিবিদরা সম্পৃক্ত থাকায় পাহাড় ধস রোধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা পূর্বকোণকে বলেন, ‘ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিলে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসি। ভূমি অফিসের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা, শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সহায়তা দিয়ে থাকি।’
২০০৭ সালের ১১ জুনের ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) সদস্য সচিব করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
পাহাড়ধস ঠেকাতে ৩৬ সুপারিশ: ভয়াবহ পাহাড়ধসের পর গঠন করা হয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর ও উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি। কমিটি পাহাড় সুরক্ষায় ৩৬ সুপারিশমালা জমা দিয়েছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— পাহাড়ে জরুরিভাবে বনায়ন, গাইডওয়াল নির্মাণ, নিষ্কাশন ড্রেন ও মজবুত সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা, পাহাড়ের পানি ও বালি অপসারণের ব্যবস্থা করা, বসতি স্থাপনাসমূহ টেকসই করা, যত্রতত্র পাহাড় কাটা বন্ধ-নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ি এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ করা, ৫ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না দেওয়া, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিলের পাদদেশে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে পর্যটন স্পট করা, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপনা নিষিদ্ধ করা, পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইত্যাদি।
এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিটি পাহাড়ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করেছিল। পাহাড়ধস রক্ষায় দীর্ঘ, মধ্যম ও স্বল্প মেয়াদি সুপারিশ করা হয়। কিন্তু ১৯ বছরে একটি সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি।
২০০৭ সালের পর থেকে গত ১৯ বছরে পাহাড়ধসে অন্তত দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।
৫৭ শতাংশ পাহাড় নিশ্চিহ্ন: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কামাল হোসাইন ‘চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় করণীয়’ নামে গবেষণা করেছেন। এতে বলা হয়েছে, একসময় নগরীতে ছোট-বড় ২০০টি পাহাড় ছিল। ইতিমধ্যে ১২০টি পাহাড় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচটি থানা (বায়েজিদ, খুলশী, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালী ও পাহাড়তলী) এলাকায় পাহাড় ছিল ৩২.৩৭ বর্গকিলোমিটার। ২০০৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৪.২ বর্গকিলোমিটার। গত ৩২ বছরে ১৮.৩৪৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছে। যা মোট পাহাড়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, আকবর শাহ, অক্সিজেনসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কাটা চলে আসছে। রাজনৈতিক পালা বদলের পর পাহাড় কাটার হাতবদল হয়। আবার পাহাড় দখল ও পাহাড় কাটায় বড় দুই দলের দারুণ মিলও রয়েছে। লালখান বাজার এলাকায় পাহাড় দখলে বড় দুই দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
দেখা যায়, পাহাড় কেটে গড়ে উঠা অবৈধ বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। কম টাকায় নাগরিক সুবিধা পাওয়ার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে আসছেন। জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা জড়িত থাকায় পাহাড় দখল ও পাহাড় কাটা রোধ করা যাচ্ছে না বলে দাবি পরিবেশবাদীদের।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির অন্তত ১৫টি সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশির ভাগ সভায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, পাহাড় কাটা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমনকি ২০০৭ সালে ভয়াবহ পাহাড়ধসে গঠিত কারিগরি কমিটির ৩৬ দফা সুপারিশও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন হয়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সহ-সভাপতি প্রফেসর ড. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘ব্যবসায়ী ও আমলারা এখন রাজনীতিবিদ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রের সম্পদকে তারা নিজেদের সম্পদ মনে করে। এক দল যাবে, আরেক দল আসবে। কিন্তু চরিত্র এক। ধনিক-বণিক ও রাজনীতিবিদ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। সর্ষে ভূত থাকলে সেই ভূত তাড়াবে কে? যতক্ষণ আন্তরিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি না হবে ততক্ষণ পাহাড় কাটা, পাহাড় ধস-বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে।’

















