চট্টগ্রাম বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক গবেষণার তথ্য

হাসপাতাল বর্জ্য পৃথকীকরণে উদাসীন ৭০% স্বাস্থ্যকর্মী

ইমাম হোসাইন রাজু

১০ জুন, ২০২৬ | ৩:৫৯ অপরাহ্ণ

দেশের শহরাঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক চরম উদাসীনতার চিত্র ধরা পড়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশের মধ্যে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উচ্চস্তরের সচেতনতা থাকলেও, বাস্তবে কর্মক্ষেত্রে বর্জ্য পৃথকীকরণের নিয়ম মানছেন না ৭০ শতাংশের বেশি নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী। হাসপাতালগুলোতে বর্জ্য আলাদা করে নির্দিষ্ট রঙের বিনে (কালার-কোডেড বিন) রাখার হার ৩০ শতাংশের নিচে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরী এবং কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় উদ্বেগজনক এই তথ্য উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ান হেলথ ইন্সটিটিউট এবং প্যাথলজি এন্ড প্যারাসাইটোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন এবং ড. তোফাজ্জল মো. রাকিবের তত্ত্বাবধানে ‘হসপিটাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট রেডিনেস ইন আরবান বাংলাদেশ: এ নলেজ, অ্যাটিটিউডস, অ্যান্ড প্র্যাকটিসেস অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন গবেষক ডা. নূর নাহার ভূঁইয়া, আর্কিটেক্ট কামরুন নাহার ভূঁইয়া, শারমিন আক্তার এবং ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস। মোট ৩৪২ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নার্সের সাক্ষাৎকার এবং কর্মক্ষেত্র পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এই গবেষণাটি সম্পন্ন হয়। গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘মেড আর্কাইভ’ প্ল্যাটফর্মে প্রি-প্রিন্ট আকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং একটি স্বীকৃত পিয়ার রিভিউড জার্নালে জমা দেওয়া হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল বর্জ্যরে পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে নার্সদের মধ্যে শতভাগ বা প্রায় শতভাগ (৯৫% থেকে ১০০%) ইতিবাচক মানসিকতা ও সচেতনতা রয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মধ্যেও এই সচেতনতার হার ৬৬% থেকে ৮৭.৩%। তবে এই জ্ঞান বা সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও যখন বাস্তবে সেই বর্জ্য আলাদা আলাদা রঙের বালতিতে ফেলার প্রয়োগ দেখা গেছে, তখন দুই শহরেরই কোনো গ্রুপই ৩০ শতাংশের বেশি নিয়ম অনুপালন দেখাতে পারেনি। অর্থাৎ, ৭০ শতাংশের বেশি কর্মীই সমস্ত বিপজ্জনক বর্জ্য একসাথে মিশিয়ে ফেলছেন।
জানার সঙ্গে চর্চার এই আকাশ-পাতাল ব্যবধানের বিষয়ে গবেষক চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস বলেন, আমাদের গবেষণার সবচেয়ে বড় এবং আশঙ্কাজনক দিক হলো- আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানেন কোন বর্জ্যটি বিপজ্জনক এবং তা না সরালে কী ক্ষতি হতে পারে, কিন্তু তারা অলসতা বা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের কারণে ডিউটির বাস্তব সময়ে নিয়ম মানছেন না। শুধু দায়সারা প্রশিক্ষণ বা মুখে সচেতনতা বাড়িয়ে এই অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও যোগ করেন, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত কালার-কোডেড বিন বা রঙের বালতির অভাব রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সুরক্ষাসামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহ থাকে না। তবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও জবাবদিহিতা না থাকা। যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ভালো কাজের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা না করে, তবে এই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, দুই প্রধান শহরের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য বিদ্যমান। চট্টগ্রাম মহানগরীতে নার্সদের চেয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রশিক্ষণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি (৪৮.৭% বনাম ২২.৫%)। তবে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এর সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা গেছে; সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের (৫২.৩%) তুলনায় নার্সদের প্রশিক্ষণের হার অনেক বেশি (৬৯.০%)।
প্রশিক্ষণের এই তারতম্যের প্রভাব পড়েছে চিকিৎসাবর্জ্যরে ধরন ও কালার-কোডেড (রঙিন বালতি) বিন চেনার ক্ষেত্রেও। উদাহরণস্বরূপ, হাসপাতালের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘ফার্মাসিউটিক্যাল বর্জ্য’ (মেয়াদোত্তীর্ণ ও অব্যবহৃত ওষুধ) ফেলার সঠিক বিনটি চট্টগ্রামের মাত্র ৩৯.৩% পরিচ্ছন্নতাকর্মী শনাক্ত করতে পেরেছেন, যেখানে চট্টগ্রামের নার্সদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬০.০%। অন্যদিকে, কুমিল্লার নার্সরা এক্ষেত্রে অনেক বেশি সচেতনতা দেখিয়েছেন, যাদের ৮২.৮% সঠিকভাবে বিন চিনতে সক্ষম হয়েছেন।
বাড়ছে মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি : ব্যবহৃত সূঁচ, সিরিঞ্জ, রক্ত ও পুঁজযুক্ত তুলা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান সাধারণ বর্জ্যরে সাথে মিশে যাওয়ায় হাসপাতালের অভ্যন্তরেই ভয়াবহ সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা, যারা প্রতিদিন সরাসরি এই বর্জ্যগুলো হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করেন। সঠিক পৃথকীকরণ না হওয়ায় হেপাটাইটিস বি, সি, এবং এইচআইভি’র মতো মারাত্মক রক্তবাহিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া এই সংক্রামক বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলায় তা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
উত্তরণের উপায় : এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে প্রশ্ন করলে গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন ও ড. তোফাজ্জল মো. রাকিব বলেন, গবেষণাটি দেখিয়েছে যে সচেতনতা ও বাস্তব চর্চার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। নিরাপদ চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কঠোর মনিটরিং, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম সরবরাহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা জোরদার করা জরুরি।
মুখ্য গবেষক ডা. নূর নাহার ভূঁইয়া বলেন, একজন চিকিৎসক এবং গবেষক হিসেবে হাসপাতালগুলোর বাস্তব চিত্র কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছি। গবেষণার ফলাফল আমাদের দেখিয়েছে যে চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে এখনও চরম ঘাটতি রয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করতে হাসপাতাল পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট গবেষকরা মনে করেন, চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই সংকট দূর করতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং কঠোর আইন প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট