চট্টগ্রাম রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবার নতুন যুগে নিরাপত্তা সংকটে!

বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস আজ

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবার নতুন যুগে নিরাপত্তা সংকটে!

তাসনীম হাসান

৭ জুন, ২০২৬ | ৪:৩৪ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের পরিচয় শুধু পাহাড়, সমুদ্র কিংবা বন্দরনগরী নয়। এই জনপদের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু অনন্য খাবারও। মেজবানি মাংস, কালাভুনা, শুঁটকি ও নোনা ইলিশ-শতাব্দীজুড়ে চট্টগ্রামের খাদ্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে আছে। একসময় পারিবারিক ও সামাজিক আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এসব খাবার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যের এই পদগুলো এখন বড় বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। আর সেখানেই উঠছে নতুন প্রশ্ন-ঐতিহ্যের এই খাবারগুলো কি আগের মতোই নিরাপদ আছে?

 

মেজবানি মাংস: পোস্তদানা, মিষ্টি জিরা, নারকেল, বাদামবাটা। সঙ্গে আরও কয়েক পদের মসলায় গরুর মাংস মেখে বড় ডেকচিতে ভরে সরিষার তেলে রান্না। মূল পদ গরুর হলেও অবশ্য রান্নার ধরন একেবারেই আলাদা। রান্নার ডেকচি থেকে চুলা-তাও ভিন্ন। বিশেষভাবে তৈরি এই রান্নাকেই বলে মেজবানি মাংস।

 

একসময় চট্টগ্রামের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই খাবার ছিল সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের খাবার। গ্রামের বাড়িতে বা পাড়ার উদ্যোগে রান্না হতো। গরু জবাই থেকে শুরু করে রান্না ও পরিবেশন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি হতো স্থানীয় মানুষের চোখের সামনেই। রান্না শেষে অল্প সময়ের মধ্যেই খাবার পরিবেশন করা হতো। কিন্তু ঘরের চৌহদ্দি পেরিয়ে মেজবানি মাংস এখন রেস্তোরাঁয়ও ঠাঁই পেয়েছে। ফলে মাংস সংরক্ষণ, পুনরায় গরম করা, পরিবহন ও পরিবেশনের মতো বিষয়গুলো যুক্ত হয়েছে। নগরে বিভিন্ন খাবারের হোটেলে তো মিলছেই, পাশাপাশি শুধু মেজবানি মাংস তৈরির আলাদা রেস্তোরাঁও গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেসব প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করলেই দেখা যাচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও সংরক্ষণ, নোংরা রান্নাঘর এবং পচা বাসি মাংসের উপস্থিতি।

 

কালাভুনা: গরু বা খাসির মাংসে তৈরি চট্টগ্রামের রন্ধনশৈলীর আরেকটি ঐতিহ্যবাহী খাবার কালাভুনা, যা বর্তমানে সমগ্র বাংলাদেশেই বিখ্যাত ও জনপ্রিয়। দেশে ঘরে ঘরে ফ্রিজের আবির্ভাবের আগে মাংসের সংরক্ষণ ব্যবস্থা তেমন ছিল না। কুরবানির সময়ে অনেক মাংস জমা হতো কিন্তু সংরক্ষণ ব্যবস্থা বলতে বারবার মাংস জ্বাল দিয়ে তা সংরক্ষণ করা হত। বার বার মাংস গরম করার ফলে জলীয় অংশ কমে গিয়ে মাংস শুকিয়ে কালো বর্ণের হয়ে যেত। কিন্তু এর ফলে সে মাংসের স্বাদ বেড়ে যেত। কালো রংয়ের জন্য এটা মুখে মুখে কালাভুনা বা হালাভুনা হিসেবে পরিচিতি পায়। জনপ্রিয়তার সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদনের পরিমাণও। ফলে আগের সেই ঘরোয়া নিয়ন্ত্রণ আর নেই। রেস্তোরাঁগুলোতে মেজবানি মাংসের মতো কালাভুনাও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্নার প্রমাণ মিলছে অহরহ।

 

শুঁটকি: চট্টগ্রামের মানুষের কাছে শুঁটকি শুধু খাবার নয়, জীবনযাত্রার অংশ। একসময় জেলেরা নিজেরা মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণ করতেন। কিন্তু বর্তমানে শুঁটকি একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক খাতে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের জন্য বিপুল পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসম্মত শুকানো, সংরক্ষণ ও পরিবহনের বিষয়গুলোও সামনে আসছে।

 

রোদে শুকানোর সময় মাছি এবং পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে এবং পচনরোধে কিছু অসাধু উৎপাদক মাছে ক্ষতিকর বিষাক্ত কীটনাশক ও অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে আসছেন। এ থেকে ক্যানসারসহ নানা মরণঘাতী রোগের আবির্ভাব হচ্ছে।

 

নোনা ইলিশ: চট্টগ্রামের আরেক ঐতিহ্য নোনা ইলিশের গল্পও প্রায় একই। ফ্রিজের যুগ আসার আগে উপক‚লের মানুষ লবণ দিয়ে ইলিশ সংরক্ষণ করতেন মাসের পর মাস। এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত নোনা ইলিশ দেশের নানা প্রান্তে যাচ্ছে। ফলে লবণের মান, সংরক্ষণ পদ্ধতি, প্যাকেজিং এবং বাজারজাতকরণের সময় খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটাই ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব খাবার আগেও হয়তো পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। তবে তখন উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দূরত্ব ছিল কম। খাবার তৈরির প্রতিটি ধাপ স্থানীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যেত। ফলে ঝুঁকির ক্ষেত্রও ছিল সীমিত। এখন ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো স্থানীয় সীমানা পেরিয়ে জাতীয়-আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে। এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জও বহুগুণ বেড়েছে।

 

ব্যবসায়ীদের মানসিকতা ও লোভের কারণেই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য অফিসার মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম।

 

তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘এ জাতীয় খাবার প্রস্তুত করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমরা পরিদর্শন করে দেখেছি খুবই খারাপ অবস্থা। অথচ মালিকপক্ষ চাইলেই এসব বিষয় এড়াতে পারেন। আমরা নিয়মিত ভৌগোলিক খাবারের গুরুত্ব, প্রস্তুত-সংরক্ষণের বিষয়ে ব্যবসায়ী ও রেস্তোরাঁ-কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছি।’

 

ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘না হলে যেমন ঐতিহ্য হারানোর শঙ্কা তৈরি হবে, তেমনি মানুষও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বেন।’

 

তাই ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো রক্ষা করতে হলে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। কেননা স্বাদ ঐতিহ্য গড়ে, নিরাপত্তাই তাকে বাঁচায়!

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট