চট্টগ্রাম রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

সিভাসুর শিক্ষিকার মৃত্যু রহস্যেই রয়ে গেল!

সিভাসুর শিক্ষিকার মৃত্যু রহস্যেই রয়ে গেল!

আইইডিসিআর’র প্রতিবেদন

ইমাম হোসাইন রাজু

৭ জুন, ২০২৬ | ৩:৫৩ অপরাহ্ণ

লক্ষণ দেখে প্রবল সন্দেহ করা হয়েছিল ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’। কিন্তু সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর)-চূড়ান্ত ল্যাব পরীক্ষায় সেই ভাইরাসের কোনো অস্তিত্বই মেলেনি। শুধু তাই নয়, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, নিপাহসহ ২১টি মরণঘাতী প্যাথোজেনের পরীক্ষাও এসেছে নেগেটিভ। মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির (সিভাসু) ফুড সায়েন্স ও টেকনোলজি অনুষদের অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির এমন আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে নতুন করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

 

সম্প্রতি আইইডিসিআর-এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন স্বাক্ষরিত এক তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনার পর সাধারণ ল্যাব টেস্টের বাইরে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা এখন ভিন্ন কোণ থেকে এই মৃত্যুরহস্যের কারণ খুঁজছেন।

 

আইইডিসিআর’র তদন্ত প্রতিবেদন ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সদ্য জাপান থেকে পিএইচডি ও পোস্ট-ডক শেষ করে দেশে ফেরা ৩৫ বছর বয়সী বিজ্ঞানী ড. জাকিয়া সুলতানা জুথি ২০২৬ সালের ২ মে প্রথম তীব্র জ্বর ও মাথাব্যথায় আক্রান্ত হন। ৪ মে অবস্থা গুরুতর হলে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দ্রুত তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে বমি, তীব্র খিঁচুনি, শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি তিনি ‘মাল্টিপল স্ট্রোক’ করেন। শেষ পর্যায়ে তার চেতনা হ্রাসের ফলে রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। শারীরিক অবস্থার এমন দ্রুত ও আশঙ্কাজনক অবনতি দেখে তাকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য দ্রুত এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ৭ মে ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রোগাক্রান্ত হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার এই পুরো সময়টি ছিল মাত্র ৫ দিন।

 

মেট্রোপলিটন হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসক ডা. কাউসারুল আলম সে সময় জানিয়েছিলেন, হাসপাতালে ভর্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই শিক্ষকের মাল্টিপল স্ট্রোক হয় এবং চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও সময় পাননি। পরে পরিবারের সদস্যরা এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যান।

 

অন্যদিকে-এভারকেয়ার হাসপাতালের এক চিকিৎসক তখন জানিয়েছিলেন, যখন রোগীকে আইসিইউ সাপোর্টে নেওয়া হয়, তখন তিনি ক্লিনিক্যালি ব্রেইন ডেড ছিলেন। এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করার পথিমধ্যে তার ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ও হয়েছিল।

 

২১ টি নমুনার পরীক্ষা ফল নেগেটিভ : সিভাসুর শিক্ষিকা জুথির মৃত্যুর পর লক্ষণগুলো ‘অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিন্ড্রোম’ বা তীব্র মস্তিষ্কের প্রদাহের সাথে মিলে যাওয়ায় এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। এর প্রেক্ষিতে আইইডিসিআর-এর একটি বিশেষ দল ১১ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত চট্টগ্রামে মাঠ পর্যায়ে তদন্ত চালায়। তবে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্টে দেখা যায়- রোগীর রক্তের নমুনা ও পরীক্ষা থেকে জাপানিজ এনসেফালাইটিস, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, নিপাহ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ দেশের প্রচলিত ২১টি প্রধান প্যাথোজেনের পরীক্ষার ফলাফল সম্পূর্ণ ‘নেগেটিভ’ আসে।

 

এদিকে, কীটতাত্ত্বিক তদন্তে সিভাসু ক্যাম্পাসে মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেলেও, জাপানিজ এনসেফালাইতিসের প্রধান বাহক কিউলেক্স মশার অস্তিত্ব মেলেনি। এছাড়া মৃতের সংস্পর্শে আসা অন্য সবার ল্যাব টেস্টও নেগেটিভ এসেছে, যার অর্থ রোগটি ছোঁয়াচে ছিল না, বরং উৎসটি ছিল একক এবং সুনির্দিষ্ট।

 

পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণ ও অচেনা সংক্রামকে আক্রমণের ধারণা : আইইডিসিআর-এর তদন্তে রোগীর পূর্ববর্তী ২-৩ সপ্তাহের একটি ভ্রমণ ইতিহাস পাওয়া গেছে, যা এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। রোগাক্রান্ত হওয়ার ঠিক পূর্বে তিনি পার্বত্য জেলা বান্দরবান, মুন্সীগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইপিজেড এলাকা ভ্রমণ করেছিলেন।

 

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, পার্বত্য অঞ্চলের গভীর বনাঞ্চল বা কোনো বিশেষ পরিবেশগত উৎস থেকে তিনি নতুন কোনো অজ্ঞাত জুনোটিক ভাইরাস বা বিরল কোনো প্যাথোজেনের সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

 

সার্বিক বিষয়ে কথার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ গবেষক ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস বলেন, ‘মেডিকেল বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে আমরা ‘সিরোনেগেটিভ এনসেফালাইটিস’ বা কোনো বিরল অটোইমিউন রেসপন্স বলতে পারি। অনেক সময় এমন কিছু বিরল বা নতুন মিউটেশন হওয়া ভাইরাস থাকে, যা আমাদের দেশের প্রচলিত ল্যাব টেস্ট কিট বা প্যানেলগুলোতে ধরা পড়ে না। লক্ষণগুলো যেহেতু শতভাগ তীব্র মস্তিষ্কের প্রদাহের ছিল এবং রোগীর পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণের ইতিহাস রয়েছে, তাই বনাঞ্চলে থাকা কোনো বিরল প্যাথোজেন বা জুনোটিক (প্রাণীবাহিত) রোগের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমন রহস্যময় কেসগুলোর ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরও উচ্চতর ‘নেক্সট-জেনারেশন সিকোয়েন্সিং’ করা প্রয়োজন।’

 

আইইডিসিআর’র চার সুপারিশ : আইইডিসিআর তাদের প্রতিবেদনে দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় চারটি জরুরি সুপারিশ করা হয়। তা হলো- সন্দেহজনক অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিন্ড্রোম (এইএস) রোগীর ক্ষেত্রে ব্লাড, সিএসএফ (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) সহ প্রয়োজনীয় নমুন দ্রæত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ‘এইএস সারভেইল্যান্স’ এর নোটিফিকেশন, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশারী করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালসমূহকে কেন্দ্রীয় নজরদারি বা সারভেইল্যান্সের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে রোগী শনাক্তকরণ এবং রিপোর্টিং বিষয়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ ও অন্যান্য ভেক্টরবাহিত রোগের ঝুঁকি হ্রাসে মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট