চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

চট্টগ্রাম কেমন শহর হবে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

চট্টগ্রাম কেমন শহর হবে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

পূর্বকোণ রিপোর্ট

২৩ মে, ২০২৬ | ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামের পরিকল্পিত উন্নয়ন সংক্রান্ত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা চট্টগ্রামের ক্ষমতা চট্টগ্রামের মানুষের হাতে ছেড়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। বলেছেন, এই শহরের সমস্যার মূল কারণ সমন্বয়হীনতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। নগর সরকার ছাড়া পরিকল্পিত চট্টগ্রাম গড়া সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের পরিচয় শুধু বন্দরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে বক্তারা আক্ষেপ করে বলেন, চট্টগ্রামের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা নিজেরাই এই নগরীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছি। এক সময়ের পরিকল্পিত নগরী এখন ধীরে ধীরে ‘কংক্রিটের জঞ্জালে’ পরিণত হচ্ছে। চট্টগ্রামকে এখন শুধু বন্দরনগরী হিসেবে ভাবলে চলবে না। এটিকে ‘ব্লু-গ্রিন স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম কেমন শহর হবে সেটি নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া এখন সময়ে দাবি।

‘স্বনির্ভর চট্টগ্রাম নগরী: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা এসব প্রস্তাব দিয়েছেন। গত ২১ মে (বৃহস্পতিবার) সকালে পূর্বকোণ সেন্টারের ইউসুফ চৌধুরী হল রুমে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্থপতি আশিক ইমরান।

আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন দৈনিক পূর্বকোণের সম্পাদক ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, সাধারণত আমরা প্রতি সপ্তাহেই চট্টগ্রামকে ঘিরে নানা সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করি। পূর্বকোণ প্ল্যাটফর্ম থেকে আমাদের মূল চেষ্টা থাকে- কীভাবে চট্টগ্রামের সম্ভাবনাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, কীভাবে নাগরিক সুবিধাগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যায়। আজকের এই আয়োজনও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।

নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে জানিয়ে পূর্বকোণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘জনগণ যাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠান, তাদের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকে-নিজ নিজ এলাকার সমস্যাগুলো সংসদে তুলে ধরা এবং সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আইনপ্রণেতাদের সহায়তায় শক্তিশালী গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক টিম কাজ করে। তারা জনগণের চাহিদা, এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনা

নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরেন। আমাদের দেশে সেই কাঠামো এখনো ততটা সুসংগঠিত নয়। এমনকি অনেক জনপ্রতিনিধির নিজ এলাকায় কার্যকর অফিস পর্যন্ত নেই, যেখানে সাধারণ মানুষ গিয়ে তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন। এই বাস্তবতা থেকেই আমরা ভাবছিÑজনগণ ও আইন প্রণেতাদের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করা যায় কি না সেটি ভেবেছি। সেই চিন্তা থেকেই ‘স্বনির্ভর চট্টগ্রাম’ শিরোনামে আমরা বিভিন্ন জায়গায় রাউন্ড টেবিল আলোচনা আয়োজন করছি। সেখানে নাগরিকদের মতামত, স্থানীয় সমস্যার চিত্র ও সম্ভাবনার দিকগুলো উঠে আসছে।’

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমরা চাই, চট্টগ্রামের প্রতিটি এলাকার মানুষের চাওয়া-পাওয়া, সমস্যা ও প্রত্যাশার একটি সুস্পষ্ট ঘোষণাপত্র তৈরি হোক। জনপ্রতিনিধিরা সেটি জানুন, বুঝুন এবং সংসদে যথাযথভাবে উপস্থাপন করুন। আমরা বিশ্বাস করি, দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে চট্টগ্রাম দেশের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জাফর আলম বলেন, বিশ্ব এখন ‘জেনারেটরস রেসপন্সিবিলিটির’ বা ‘পলিউটারস পে প্রিন্সিপাল’-এর কথা বলছে। অর্থাৎ, যে দূষণ করবে, তাকেই এর দায় নিতে হবে। কিন্তু আমরা কী করছি? বাড়ির সব বর্জ্য একসঙ্গে মিশিয়ে সিটি কর্পোরেশনের হাতে তুলে দিচ্ছি। এরপর মেডিকেল বর্জ্যসহ সবকিছু গিয়ে ফেলছে আনন্দনগর বা আরেফিন নগরের মতো জায়গায়। সেখান থেকে তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত লিচেট, যা ভ‚গর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে। আজ মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, ডাক্তার ওষুধ দিচ্ছেন, কিন্তু কেউ বুঝতে পারছেন না-পানির ভেতরেই বিষ ঢুকে গেছে।

চট্টগ্রামের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোনো চিন্তায় আটকে আছে মন্তব্য করে জাফর আলম আরও বলেন, অথচ আধুনিক পৃথিবী বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করছে, গ্যাস তৈরি করছে, সম্পদ তৈরি করছে। সিউলে আমি নিজে দেখেছি-একসময় যেখানে ময়লার স্তূপ ছিল, আজ সেখানে সবুজ পাহাড়, গলফ ক্লাব, এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্র।

বন্দরনগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়েও কথা বলেন জাফর আলম। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-পরিকল্পনাগুলো কতটা বাস্তবভিত্তিক? পানি কোথা দিয়ে যায়, কোথায় জমে- এটা সবচেয়ে ভালো জানে স্থানীয় মানুষ। কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা না বলেই প্রকল্প করা হচ্ছে।’

চট্টগ্রামের জন্য ফ্লাইওভার-এক্সপ্রেসওয়ে নয়, প্রয়োজন ছিল বিআরটি (বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট) ও এমআরটি (ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট) জানিয়ে জাফর আলম বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের একটি সম্ভাব্য প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। আমি নিজে রুট ম্যাপ তৈরি করে দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হলো? পুরো শহরের বুকের ওপর ফ্লাইওভার চাপিয়ে দেওয়া হলো। ফ্লাইওভার দিয়ে কোনো শহরের ট্রাফিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।’

জাফর আলম জানান, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি কিন্তু এখনো রেল ও নদীপথ। চট্টগ্রাম-পাহাড়তলী-সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী, চট্টগ্রাম-পটিয়া-এসব রেল করিডোরকে আধুনিক নগর পরিবহনে রূপান্তর করা গেলে শহরের ওপর চাপ অনেক কমে যাবে। একইভাবে কর্ণফুলী ও হালদা নদীকে ব্যবহার করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট চালু করা সম্ভব।

বন্দরের বর্তমান অবস্থান শহরের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে মন্তব্য করে জাফর আলম আরও বলেন, ‘আমি বন্দরে আট বছর কাজ করেছি। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বর্তমান অবস্থানে বন্দর এখন শহরের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্দরের ৭০ শতাংশ কনটেইনার ঢাকামুখী, আর তার ৯৬ শতাংশ যায় সড়কপথে। অর্থাৎ বিশাল ট্রাক শহরের ভেতর দিয়েই চলাচল করছে। পৃথিবীর উন্নত শহরগুলোতে এভাবে হয় না। সেখানে ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডোর থাকে, রেলভিত্তিক পরিবহন থাকে। চট্টগ্রামকে এখন শুধু বন্দরনগরী হিসেবে ভাবলে চলবে না। এটিকে ‘ব্লু-গ্রিন স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

চট্টগ্রামকে শুধু ‘ডেভেলপ’ করলেই হবে না, চট্টগ্রামকে ‘রিবিল্ড’ করতে হবে জানিয়ে জাফর আলম বলেন, ‘কোথাও নির্দয়ভাবে ভাঙতে হবে, ফুটপাত ফিরিয়ে আনতে হবে, ড্রেনেজ ঠিক করতে হবে, নদী বাঁচাতে হবে, সবুজ ফিরিয়ে আনতে হবে। তবেই আবার সেই চট্টগ্রাম ফিরে আসবে, যার সৌন্দর্যের বর্ণনা ইবনে বতুতা দিয়েছেন, হিউয়েন সাং দিয়েছেন, আল-ইদ্রিসি দিয়েছেন।’
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার কাঠামো ছাড়া পরিকল্পিত নগরী অসম্ভব উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ও গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া চট্টগ্রামের কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ১৯৭৮ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারে পেশাজীবী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীতে তা বাতিল করা হয়।

চট্টগ্রামের ক্ষমতা চট্টগ্রামের মানুষের হাতেই দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী যেভাবে ‘মেট্রোপলিটন গভর্মেন্ট’ বা নগর সরকারের দাবি তুলেছিলেন, তা সংবিধানেই রয়েছে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি।

জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যেকোনো সমস্যার জন্য আমরা সংসদ সদস্যদের (এমপি) কাছে ছুটে যাই। কিন্তু সংবিধানে স্থানীয় এলাকার নির্বাহী কাজ বা তার জবাবদিহিতা সরাসরি এমপিদের ওপর ন্যস্ত করা হয়নি। উনারা আসেন, কিছু কথা বলেন এবং চলে যান। মূল ক্ষমতা থাকতে হবে স্থানীয় সরকারের কাছে।

দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিযার অন্যতম শক্তিশালী উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি থানায় ১২-১৩ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার কথা, প্রতিটি ইউনিয়নে হেলথ কমপ্লেক্স এবং গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কারণে এগুলো অকার্যকর হয়ে আছে। রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাবের কারণে মূল চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। এতজন বিশেষজ্ঞের মধ্যে পালাক্রমে মাত্র এক-দুজন যান, বাকিরা গ্রামে যেতে চান না। গণমাধ্যম যদি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক খোঁজ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তবে সিভিল সার্জন অফিসের দুর্বলতা ঢাকা দিতে পরদিন থেকেই সব ডাক্তার দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হবেন।

প্রশাসনিক ও আইনি দুর্নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, রেলওয়ে নীতিমালায় সিআরবি’র জমি লিজ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। এমনকি সিডিএ কর্তৃক ড্যাপ এলাকা বা ঐতিহ্য অঞ্চল ঘোষিত হওয়ায় সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ আইনত নিষিদ্ধ। অথচ অর্থ ও ক্ষমতার জোরে আইন ভেঙে সেখানে স্থাপনা তৈরির চেষ্টা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিনিয়ত মাঠে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করতে হচ্ছে।

ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, বছরের পর বছর পার হলেও চট্টগ্রামের এই বিপজ্জনক জলাবদ্ধতা ও নাগরিক দুর্ভোগের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সরকারি বড় বড় প্রকল্প বা আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চট্টগ্রামের উন্নয়ন হবে না। জলাবদ্ধতা দূরীকরণ বা পরিকল্পিত নগরী গড়তে হলে সরকারি ঘোষণার অপেক্ষা না করে, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সোচ্চার হতে হবে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে বাধ্য করতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘদিনের যানজট, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা ও নাগরিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী খান মো. আমিনুর রহমান। তিনি বলেন, নগরীর বিভিন্ন সড়কে অপ্রয়োজনীয় ব্যারিকেড, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও সমন্বয়হীন উন্নয়ন কর্মকর্তাদের কারণে প্রতিদিন সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

নগরীর কয়েকটি পয়েন্টে ট্রাফিকের চিত্র তুলে ধরে এই প্রকৌশলী বলেন, সকালে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় ওমেন কলেজ মোড়ে ট্রাফিক বিভাগের ব্যারিকেডের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উইলিয়াম কেরি স্কুলসংলগ্ন সড়ক কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় যানবাহনকে বিকল্প পথে এমইএস কলেজের সামনে ঘুরে যেতে হয়। এতে পুরো এলাকায় যানজট আরও বাড়ছে। কিছু ট্রাফিক সদস্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা জনদুর্ভোগ বাড়িয়েছে।
তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ খুলশী ১ নম্বর রোডের মুখে নির্বাচনী সময়ে একটি অস্থায়ী কার্যালয় তৈরি করা হয়। যা এখনো অপসারণ না করায় সেখানে প্রতিদিন যানজট তৈরি হচ্ছে। ওই স্থাপনাটি এখন দলীয় কার্যালয় বা আড্ডাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা সড়কের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। বিষয়টি পূর্বকোণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

 

ওয়াসার মোড়ে নির্মাণাধীন মার্কেট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রকৌশলী আমিনুর রহমান। তিনি বলেন, রাস্তার বড় অংশ দখল করে নির্মাণকাজ চলায় প্রতিদিন যানজট বাড়ছে। ভবিষ্যতে মার্কেট চালু হলে পার্কিং সংকট ও যানবাহনের চাপ আরও বাড়বে।
চট্টগ্রাম একসময় সুন্দর ও পরিকল্পিত নগরী ছিল উল্লেখ করে প্রকৌশলী খান মো. আমিনুর রহমান বলেন, এক সময়ের পরিকল্পিত নগরী এখন ধীরে ধীরে ‘কংক্রিটের জঞ্জালে’ পরিণত হচ্ছে। বিল্ডিং কোড না মেনে যত্রতত্র ভবন নির্মাণ, খোলা জায়গা ও ড্রেন দখল এবং অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের কারণে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হতে পারছে না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম শহরের পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ঊর্ধ্বতন স্থপতি মো. গোলাম রব্বানী চৌধুরী। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ নগরী হিসেবে চট্টগ্রামকে নতুন করে পরিকল্পিত শহরে রূপ দেওয়া সহজ নয়; বরং বাস্তবতা বিবেচনায় ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ করেই এগোতে হবে।
নগরীকে সম্প্রসারণের বিকল্প নেই উল্লেখ করে গোলাম রব্বানী চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামকে অনেকটা পুরান ঢাকা বা পুরান কলকাতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। একদিকে নদী, অন্যদিকে সাগর ঘেরা শহরটি স্বাভাবিকভাবেই সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। ফলে শহর সম্প্রসারণ ছাড়া বিকল্প নেই। সিডিএ ইতোমধ্যে আনোয়ারা অঞ্চলে নগর সম্প্রসারণের বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে এবং বর্তমান সরকারের নীতিতেও এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

সিডিএ’র নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে সিডিএ’র ঊর্ধ্বতন এই স্থপতি বলেন, ১ হাজার ১৫২ বর্গকিলোমিটার এলাকার উন্নয়ন তদারকিতে সংস্থাটিতে পর্যাপ্ত জনবল নেই। ২০২৬ সালে এসেও জনবল কাঠামো প্রায় ১৯৮৪ সালের পর্যায়েই রয়েছে। যে শহরে হাজার হাজার ভবন, সেখানে মাত্র কয়েকজন ইন্সপেক্টর দিয়ে কার্যকর নজরদারি সম্ভব নয়। অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে অনিয়ম ও ভুল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

গোলাম রব্বানী বলেন, চট্টগ্রামে পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতির দীর্ঘদিন ঘাটতি ছিল। ২০০৮ সালের আগে সিডিএতে প্রশিক্ষিত পরিকল্পনাবিদও ছিল না। বর্তমানে ধীরে ধীরে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ অবস্থায় চুয়েটসহ স্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগর উন্নয়ন কার্যক্রমে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, সিডিএ কেবল প্লট বরাদ্দ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। আবাসিক এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করেই উন্নয়ন কার্যক্রম শেষ করতে হবে। অন্যদিকে, শহরের ট্রাফিক সংকটের জন্য স্কুল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘ড্রপিং বে’ না থাকার বিষয়টিকেও তিনি দায়ী করেন। বিল্ডিং নকশা অনুমোদনের শর্তে এসব সুবিধার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি বলে উল্লেখ করেন।

পাহাড় রক্ষা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ গোলাম রব্বানী চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান আইনে পাহাড় সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বাস্তব প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পাহাড় কাটার অনুমতির বিধান থাকলেও পাহাড় রক্ষার কার্যকর নির্দেশনা অনুপস্থিত।

অকুপেন্সি সার্টিফিকেট প্রসঙ্গে গোলাম রাব্বানী বলেন, চট্টগ্রামের প্রায় ৯৯ শতাংশ ভবনের এই সনদ নেই। অথচ নিয়ম অনুযায়ী অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো ভবনে বিদ্যুৎ, পানি বা গ্যাস সংযোগ পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন সংস্থা সমন্বয়হীনভাবে এসব সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা এখন প্রায় স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করে সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি এডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, পাহাড় কাটা ও খাল-নালা ভরাটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ভারী বৃষ্টিতে নালা ও রাস্তা একাকার হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বিপদে পড়ছেন। গত কয়েক বছরে ড্রেনে পড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে মানুষ সাঁতার না জানায় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে।

তিনি নগরীর পুকুরগুলোকে সাঁতার শেখানোর কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। বলেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক পুকুর অব্যবহৃত ও দূষিত অবস্থায় পড়ে আছে। এসব পুকুরে প্রশিক্ষকের মাধ্যমে স্বল্প খরচে শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখানো গেলে জীবন রক্ষা হবে, পুকুর রক্ষাও সম্ভব হবে।

আকতার কবির বলেন, নগরীতে বড় বড় সড়ক নির্মাণ হলেও রাস্তা শাসন নেই। সাইকেল চালানোর আলাদা লেন নেই। মানুষ হাঁটার ফুটপাত নেই। ফুটপাত দখল, দোকানের মালামাল সড়কে ফেলে রাখা এবং ইচ্ছেমতো গাড়ি দাঁড় করানোর কারণে যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমরা শহর সম্প্রসারণের কথা বলি। কিন্তু কর্ণফুলী সেতুতে অযৌক্তিকভাবে টোল আদায় করি। তাহলে মানুষ শহরতলী থেকে শহরে প্রতিদিন আসবে কীভাবে?

শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, নাগরিক সচেতনতা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে চট্টগ্রামের সংকট আরও গভীর হবে বলে মন্তব্য করেন আকতার কবির। তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কারণ বড় বড় কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম শহরে থাকতে চান না। এভাবে চললে চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

চট্টগ্রাম মহিলা পরিষদের সভাপতি লতিফা কবির বলেন, চট্টগ্রাম নগরীকে নারীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে সবার আগে নারীদের যাতায়াত ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা দরকার। বাসে নারীদের জন্য সিট থাকে না। ড্রাইভারের পাশে, ইঞ্জিনের পাশে বসতে হয়। সেখানে বসে অনেকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। তাই নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা দরকার। অন্তত বাসের দুই পাশের সিট থেকে কিছু আসন তাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা উচিত।

তিনি বলেন, কর্মজীবী মায়েরা নিশ্চিন্তে কাজ করার জন্য প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ডে কেয়ার সেন্টার থাকা জরুরি। নগরীর প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকায় নারীদের জন্য নিরাপদ ওয়াশরুমের ব্যবস্থা, ব্রেস্টফিডিং কর্নার দরকার। ইভটিজিং বন্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী পুলিশ মোতায়েন করা যেতে পারে। কম শিক্ষিত নারীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিলে তারাও কর্মক্ষম হবে। সিটি কর্পোরেশন এ ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিতে পারে।

নারী-শিশুদের জন্য বিনোদনের তেমন ব্যবস্থা নেই উল্লেখ করে এই নারী নেত্রী বলেন, নগরীতে শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। তাদের বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ ছিল। বছরে একবার করে খেলার আয়োজন করা হতো। এখন সেটা বিলুপ্তির পথে। খেলার মাঠে মেলা আয়োজন করা হচ্ছে। ফলে ছেলে-মেয়েরা মোবাইলের দিকে বেশি ধাবিত হচ্ছে। মাদকাসক্ত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রæপের সহ-সভাপতি ও সিটি সার্ভিস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তরুণ দাশগুপ্ত ভানু বলেন, অবৈধ ও নিয়মনীতিহীন ছোট গাড়ির দাপটে চট্টগ্রামের গণপরিবহন ব্যবস্থা, বিশেষ করে বাস খাত এখন ধ্বংসের মুখে। কালুরঘাট থেকে চকবাজার হয়ে কোতোয়ালী এবং মুরাদপুর রুটে এখন কোনো বাস নেই। রুট ভাগাভাগি ও লোকসানের কারণে মালিকরা বাস চালানোয় উৎসাহ হারাচ্ছেন।

তিনি বলেন, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে ম্যাক্সিমা, হিউম্যান হলার ও টেম্পুগুলো একটি রুটকে চার ভাগে ভাগ করে যাত্রী পরিবহন করছে। একটি পারমিট দিয়ে পাঁচটি পর্যন্ত গাড়ি চালানো হচ্ছে এবং ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করা হচ্ছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর একটি মালিক সমিতিকে ভেঙে আটটি করা হয়, যার ফলে পরিবহনে চেইন অব কমান্ড ভেঙে গেছে। বর্তমানে বাসে সিট ক্যাপাসিটি অনুযায়ীও যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না এবং ২ নম্বর রুটের বাসগুলো এখন কেবল গার্মেন্টসের ভাড়ার ওপর নির্ভর করে টিকে আছে।
পরিবহন খাতকে বাঁচাতে প্রশাসন ও বিআরটিএ’র হস্তক্ষেপ দাবি করে তিনি বলেন, অনতিবিলম্বে এসব অবৈধ ছোট গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সুন্দর ও পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রশাসনের মাধ্যমে সকল বিচ্ছিন্ন মালিক সমিতিকে একক ছাতার নিচে এনে একটি জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

পতেঙ্গা-ইপিজেড সচেতন নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ও সাংবাদিক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো- বন্দর, কাস্টমস, ইপিজেড ও তেল সেক্টর সমৃদ্ধ এত বড় একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কোনো মানসম্মত সরকারি হাসপাতাল নেই। দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হওয়া সত্তে¡ও বন্দর-পতেঙ্গা ও ইপিজেড অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ আজ তীব্র স্বাস্থ্য সেবা সংকট ও সুপেয় পানির অভাবে ভুগছেন। সিডিএ-র তদারকিহীনতায় অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও খাল-নালা ভরাটের কারণে জলাবদ্ধতা প্রকট হচ্ছে এবং ভেতরে ভেতরে কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিস্তার বাড়ছে।
#প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক তাসনীম হাসান, ইমরান বিন ছবুর, ইমাম হোসেন রাজু ও মিজানুর রহমান।

পূর্বকোণ/রাকিব

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট